জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদলের একাংশের বিরুদ্ধে। হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ফিরোজ আহাম্মেদ পাপনের নেতৃত্বে ৫৪ ও ৫৫ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী তালা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন হলের শিক্ষার্থীরা। তবে তালা দেওয়ার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন পাপন।
এ ঘটনায় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. খন্দকার লুৎফুল এলাহী ও সহকারী প্রক্টর আবদুছ ছাত্তার জয় হলে আসেন। এ সময় হলের সাধারণ শিক্ষার্থী, হল ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ, জাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, সভাটি প্রভোস্টের কক্ষে করার সুবিধার্থে তারা হল ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ আহাম্মেদ পাপনকে কক্ষের তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে তিনি এতে রাজি হননি। বরং ডাইনিংয়ে বসে সভা করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সম্মতিতে হলের এক কর্মচারীর মাধ্যমে প্রভোস্টের কক্ষের তালা খোলা হয়। এরপর প্রভোস্ট, সহকারী প্রক্টর ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিফট, জেনারেটর, ডাইনিংয়ের খাবারের মান, গেটসহ মোট ১৩টি সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়ে কথা হয়।
তবে ওই আলোচনায় হল ছাত্রদলের সভাপতি পাপন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ৫৪ ও ৫৫ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন না বলে দাবি করেন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা চলাকালে পাপন একবার সেখানে এসে ‘তালা খুলল কে’ এবং ‘কার দায়িত্বে তালা খোলা হয়েছে’—এমন প্রশ্ন করেন। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান।
আলোচনা শেষে প্রভোস্ট, সহকারী প্রক্টর ও শিক্ষার্থীরা কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেন, “প্রভোস্ট কক্ষে তালা দেওয়ার সঙ্গে ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমরা হল ছাত্রদল, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যবৃন্দ, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং সমাধানের বিষয়ে মতামত দিয়েছি। যিনি হল অফিসে তালাবদ্ধ করেছেন, তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “জাবি ছাত্রদলের সভাপতি জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম আহমেদ অনীক সবাইকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন। সেখানে কেউ ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে তালা দিতে পারেন না। এটি সংগঠনের দলীয় শৃঙ্খলাবিধির লঙ্ঘন।”
জাতীয় ছাত্রশক্তি জাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল রিয়াজ বলেন, “যদি হলের সমস্যা সমাধানের দাবিতেই তালা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উপস্থিত না থাকার কারণ কী—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। হলের সমস্যা সমাধানের কার্যকর পথ আলোচনা ও সমন্বয়।”
তিনি আরও বলেন, “হল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করতে পারেন, তবে এর অর্থ এই নয় যে হলের সব শিক্ষার্থীকে একই অবস্থান নিতে হবে।”
হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. খন্দকার লুৎফুল এলাহী বলেন, “শুনেছি হল ছাত্রদলের সভাপতি ও কয়েকজন জুনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থী হল অফিসে তালা দিয়েছেন। তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেই আমরা সহকারী প্রক্টর, সকল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সভা করতে হলে এসেছি। কিন্তু অফিস তালাবদ্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রথমে তালা খুলে দিতে অনুরোধ করে। পরে তারা না শুনলে শিক্ষার্থীরাই সর্বসম্মতিক্রমে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা করে।”
তিনি বলেন, “লিফট, জেনারেটর, ডাইনিং, গেটসহ ১৩টি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছি। তবে আলোচনায় অংশ না নিয়ে সভা শেষে সবাই বের হয়ে গেলে হল ছাত্রদলের সভাপতি অফিসটি আবারও তালাবদ্ধ করেন।”
সহকারী প্রক্টর আবদুছ ছাত্তার জয় বলেন, “কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হল অফিস তালাবদ্ধ করে শিক্ষার্থীদের সেবা গ্রহণে ব্যত্যয় ঘটালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ওই সংগঠনও বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে প্রত্যাশা করি।”
অভিযোগের বিষয়ে হল ছাত্রদলের সভাপতি মো. ফিরোজ আহাম্মেদ পাপন বলেন, “হলের নানাবিধ সমস্যা সমাধান না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল অফিসে তালাবদ্ধ করেন। আমরা আলোচনার জন্য অফিসের বাইরে বসার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কয়েকজন শিক্ষার্থী সেটা অমান্য করে তালা ভেঙে অফিসে সভা করে। আমরা তাই সভা বয়কট করে বেরিয়ে আসি। সভা শেষে পুনরায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তালা ঝুলিয়ে দেয়।”
তালা দেওয়ার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে পাপন বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তালা দিয়েছেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী বলতে কারা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি চারজনের বেশি কারও নাম বলতে পারেননি। একইসঙ্গে তালা দেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কী কী দাবি ছিল, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো লিখিত দাবিপত্র দেখাতে পারেননি।
ঘটনাটি নিয়ে হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষের অভিযোগ, একক সিদ্ধান্তে প্রভোস্টের কক্ষে তালা দিয়ে হলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা হয়েছে; অন্যদিকে পাপনের দাবি, হলের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তালা দিয়েছেন এবং তিনি আলোচনার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি সংবাদেও তাজউদ্দীন হলের প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়া, শিক্ষার্থীদের তা ভেঙে আলোচনা করা এবং পরে পুনরায় তালা দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।