জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বটতলা ও আরটিএইচ (RTH) চত্বরের বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক কর্মী কাজ করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অন্তত ১২টি হোটেল ও খাবারের দোকানে মোট ৭৩ জন কর্মীর মধ্যে ১৮ বছরের নিচে রয়েছে অন্তত ৩১ জন। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
তথ্য অনুযায়ী, আল মদিনা, সুজন হোটেল, তাজমহল, রাবেয়া ভর্তা বাড়ি, নুরজাহান, রাধুনি, বামের দোকান, জান্নাতুল কফি হাউজ, জমজম জুস ভান্ডার, ইলিয়াস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, খোরাক ও ক্রেভিংস কর্নার—এসব প্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্করা খাবার পরিবেশন, থালা-বাসন পরিষ্কার, রান্নাঘরের সহকারীসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
কাজ করা কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংসারের অভাবই তাদের স্কুলের বদলে কর্মস্থলে নিয়ে এসেছে।
১৬ বছর বয়সী এক কর্মী বলেন, ‘বাড়িতে বাবা অসুস্থ। সংসারে নিয়মিত আয় করার মতো কেউ নেই। এখানে কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে পরিবারের খাবার-দাবার চলে। পড়াশোনা করতে ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এখন পরিবারের দায়িত্বই আগে।’
১৫ বছর বয়সী আরেক কর্মীর ভাষ্য, ‘আমরা কাজ না করলে বাসায় রান্না হয় না। ছোট ভাইবোন আছে। তাদের জন্যই কাজ করছি।’ ১৭ বছর বয়সী এক কর্মী বলেন, ‘সারাদিন কাজ করি। মাস শেষে যে টাকা পাই, পুরোটা বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। নিজের জন্য তেমন কিছুই রাখি না।’
এ বিষয়ে কয়েকজন হোটেল মালিক বলেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের কাজে নিচ্ছেন না; বরং মানবিক দিক বিবেচনা করেই সুযোগ দিচ্ছেন।
ক্রেভিংস কর্নারের মালিক ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ‘আমরা বড় বয়সী কর্মী খুঁজে পাই না। যারা আসে, তারা বেশিদিন থাকে না বা বেশি বেতন চায়। এই ছেলেগুলো নিজেরাই কাজের জন্য আসে। অনেকের পরিবারে উপার্জন করার আর কেউ নেই। মানবিক দিক বিবেচনা করেই তাদের কাজ দিই।’
ইলিয়াস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক ইলিয়াস বলেন, ‘আমরা কাউকে জোর করে কাজে রাখি না। তারা নিজেরাই কাজ করতে আসে। তাদের কাজ না দিলে অনেক পরিবার আয়ের উৎস হারাবে। তবে সুযোগ পেলে তারা যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সেটাই আমরা চাই।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে শিশু শ্রমের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আইন বিভাগের ৪৮তম আবর্তনের শিক্ষার্থী নোমান বিন হারুন বলেন, ‘শিশু শ্রমকে শুধু আইন দিয়ে দেখলে হবে না, এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও দেখতে হবে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এত সংখ্যক অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক থাকা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। প্রশাসন, শ্রম অধিদপ্তর ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে পরিবারগুলো বিকল্প আয়ের সুযোগ পায় এবং শিশুরা শিক্ষায় ফিরে যেতে পারে।’
বাংলা বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী নাঈম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার জায়গা। অথচ এখানেই শিশুদের পড়ার টেবিলের বদলে হোটেলে কাজ করতে দেখা যায়, যা আমাদের জন্য লজ্জার। শুধু দোকান মালিকদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
শ্রম আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্কদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোরদের শ্রমে যুক্ত থাকার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, দারিদ্র্য নিরসন ও শিক্ষাবান্ধব সামাজিক সহায়তা বাড়ানোই এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।