প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণ ও রাকসু ভবনে হামলা

রাবিতে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীকে রাকসু নেতাদের মারধর, গ্রেপ্তার- ২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণ ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এক রাকসু নেতাকে মারধরের ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীসহ তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় বেধড়ক পিটিয়েছেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর ও বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দফায় দফায় এই ঘটনা ঘটে।

তবে এর আগে দুপুরে রাকসু ভবনে জিএস আম্মারসহ এক রাকসু নেতার উপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আনাসসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে। এতে রাকসু তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মীসহ হামলার সঙ্গে জরিতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ করে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির ও রাকসু নেতারা। সন্ধ্যায় মামলায় দুজনকে আটকের পরে বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন তারা।

আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। তাদের পূর্বের কোনো একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে। বর্তমানে তারা দুইজন চিকিৎসাধীন আছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুলিশ আনাস ও হাসান নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির জন্য ভিসি স্যার দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্যরা প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’

রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাকসু নেতাদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিচারে আমাদের যে দাবি ছিল, প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে তা নিশ্চিত করেছে। তারা আমাদের জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকেই এই মামলা করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হলো, সহিংসতা চালিয়ে ছাত্রলীগের মতো সংগঠন এই ক্যাম্পাসে টিকে থাকতে পারবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী তার নিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় হুমকির অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল রাতে একটি সভায় বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে নিজ এলাকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, একই বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।

এ বিষয়ে আজ সোমবার দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিযোগ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এসজিএস এস এম সালমান সাব্বিরসহ রাকসুর নেতারা। পরে রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন চেক করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হীল গালিবসহ কয়েক জন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি খুজেঁ বের করেন। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তরে জিএস আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির মারধর করেন। পরে বিষয়টি দুপুরেই প্রক্টর বিষয়টির সাময়িক সমাধান করে দেন এবং আনাসসহ বাকীরা প্রক্টর দপ্তর থেকে চলে আসেন।

এরপরে বিকেল তিনটার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন এই ঘটনার জেরে রাকসু ভবনে অতর্কিত হামলা করেন। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপরে পাল্টা চড়াও হলে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে আসেন।

এর পরে সেখানে আসেন রাকসু জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, আহত বিএম নাজমুস সাকিব, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, শাখা শিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, দপ্তর সম্পাদক মানাজির আহাসান, অর্থ সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও শাখা শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজা, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানুল্লাহ ফারহান, জিএস আশিক শিকদার, নবাব আব্দুল লতীফ হল জিএস নুরুল ইসলাম শহীদ, ‘শিবির ক্যাডার’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পুর্নবিবেচনায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী রমজান আলীসহ অন্যান্যরা।

এ সময় রাকসু জিএস আম্মার দূর থেকে ওই শিক্ষার্থীদেও উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীরাও গালির প্রতিউত্তর দেন। এক পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবুর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠকক্ষের ভেতরে নিয়ে যান।

পরে শিবির ও রাকসু নেতারা অতর্কিতভাবে পাঠকক্ষের ফটক থেকে প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা ওই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তুমুল মারধর শুরু করেন। এ সময় তারা হাতের কাছে পাওয়া কাঠ, বাশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোটা দিয়ে তাদেরকে পেটান রাকসু ও শিবির নেতারা। পরে তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করেন উত্তেজিত শিবির ও রাকসু নেতারা।

পরে ওই শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় রেখে শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা। এর কিছু সময় পরে গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে ভেতরের একটি গেট দিয়ে নিয়ে মূল ফটক দিয়ে এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক।

পরে এম্বুলেন্সে তোলার সময় ফাহিম রেজা ও সাবেক শিবির নেতা রমজান আলী ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’ বলে আরও এক দফা হামলা করেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে এম্বুলেন্স থামিয়ে তাকে নামিয়ে আবারও বেধড়ক লাথি মারেন এবং টেনে হিচড়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর পরে রাকসু ও শিবির নেতারা এক হয়ে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘হাতে তালি, শিবির’, ‘মুখে বলি, শিবির’, ‘ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’। পরে বিকেল সাড়ে চারটা থেকে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন শিবিরের নেতাকর্মীরা।

হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠকক্ষে অধ্যয়নরত পদার্থ বিজ্ঞানের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, আমরা এখানে পড়তেছিলাম। তারপর তারা অতর্কিত সবাই রিডিং রুমে ঢুকে পড়ে। তারা যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছে।

অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তারা উগ্র হয় এবং হামলা করে। মতের পার্থক্য থাকলেই তাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। ছাত্রলীগ হলেও তাকে মেরে ফেলার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।

হামলার শিকার সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আনাস বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তারা আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করে। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাদের সাথে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করে। আমার উপর কমপক্ষে ২০০টিরও বেশি আঘাত করা হয়েছে।

তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী নন এ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে আমার বন্ধুরা হয়তো ছাত্রলীগ করতো তাই হয়তো কোনো এক জায়গায় তাদের সাথে আমার ছবি রয়েছে। তবে ছাত্রলীগের ব্যানার – ফেস্টুনে আমার কোনো ছবি নেই।

হামলার বিষয়ে শিবিরের দায় অস্বীকার করে শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘এখানে শিবিরের কেউ ছিলো না। আমরা আমাদের ভাই রাকসু নেতাদের হামলার কথা শুনে দ্রুত এখানে আসি। এখানে এসে এই পরিস্থিতি দেখতে পাই।’ হামলার ঘটনায় শিবিরকে দেখা গেছে এবং এর ভিডিও ফুটেজও আছে, এটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

জানতে চাইলে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমাদের রাকসু ভবনে গিয়ে মারধর করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনকে আমরা ছাত্রলীগের ওই নেতাকে পুলিশে দেওয়ার আহ্বান জানাই। তবে তারা তাকে কিছুই করেনি। আমাদের ওপরে হামলার পরে বাধ্য হয়ে আমাদের এখানে আসতে হলো।

এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, যে নারীকে নিয়ে ঝামেলার শুরু, আমরা জেনেছি তাকে শিবিরের এক নেতা পছন্দ করতেন। এই কারণে একটি নারী ঘটিত বিষয়কে গোপনে সমাধান না করে শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। আমরা আমাদের পবিত্র জায়গা লাইব্রেরিতে শিবিরের এই হামলার তীব্র নীন্দা জানাই। যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপওে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে নির্মম হামলা চালিয়েছে তাদের ছাত্র সংসদের পদ ও ছাত্রত্ব উভয়ই বাতিল করতে হবে।