আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকী (জার্নাল) থেকে বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি, গবেষণায় অনিয়ম, ভুয়া পিয়ার রিভিউ, তথ্য বিকৃতি ও অন্যান্য অসদুপায়ের অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ১৮ জন শিক্ষক ও ৪ শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্ট মোট ৩২টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান ও অ্যাকাডেমিক সততা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশবিজ্ঞান, গণিত, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংসহ মোট ১১টি বিভাগ এবং ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের শিক্ষকদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ১০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের। একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কবির উদ্দিনের দুটি গবেষণাপত্রও প্রত্যাহার হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের আরও একাধিক শিক্ষকের এক বা একাধিক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঞ্জার, এলসেভিয়ার, ওয়াইলি, প্লস ওয়ান, আইইইই এবং আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জাবির চার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর নাম থাকা কয়েকটি গবেষণাপত্রও প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্যভান্ডার রিট্রাকশন ওয়াচ–এর ডাটাবেজে উল্লেখ রয়েছে।
প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের সঙ্গে জাবির যেসব শিক্ষকের নাম রয়েছে তারা হলেন— পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান (১০টি), অধ্যাপক ড. মো. কবির উদ্দিন (২টি), গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম (৩টি), সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম (২টি), অধ্যাপক ড. আবেদা সুলতানা (১টি), অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কুমার পণ্ডিত (১টি)।
পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন (২টি), অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক (১টি), অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদার (১টি), বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সোহেল (১টি), সহকারী অধ্যাপক নাফিসা নাওয়াল ইসলাম (১টি), কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুশফিক আনোয়ার (১টি)।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এ. মামুন (১টি), অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম (১টি), রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এনামুল হক (১টি), পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (১টি), ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত হোসেন (১টি) এবং ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ড. কে. এম. জাহিদুল ইসলাম (১টি)।
এছাড়া প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রে জাবির চার শিক্ষার্থী— মো. নাজমুল ইসলাম প্রত্যয়, মো. ইস্তিয়াক রহমান, মিনহাজ আবদুল্লাহ আল মুইদ এবং জাহিদুর রহিমের নামও রয়েছে।
ডাটাবেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুয়া বা অনিয়মিত পিয়ার রিভিউ, সাইটেশনে অনিয়ম, তথ্যের অসঙ্গতি ও বিকৃতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার-জেনারেটেড কনটেন্টের ব্যবহার এবং তথাকথিত ‘পেপার মিল’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানহীন গবেষণাপত্র তৈরির অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা আমি সঠিকভাবে জানি না। তবে এই ঘটনার পর আমি সতর্ক হয়েছি এবং বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।”
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, গবেষণার সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কার্যকর গবেষণা নৈতিকতা নীতিমালার অভাব এমন পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
জাবির প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কবিরুল বাশার বলেন, “র্যাংকিং বা সাইটেশনের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার গুণগত মান বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত গবেষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামও নষ্ট হচ্ছে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে তদন্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে ইউজিসি প্রয়োজনীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, ”গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না, কারা কী ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনা হবে। যদি কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা গবেষণা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের এই ঘটনা জাবিতে গবেষণার মান, প্রকাশনা-নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অ্যাকাডেমিক সততা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে সংখ্যার পরিবর্তে গবেষণার গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।