জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত সদস্য হিসেবে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খানকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশকে কেন্দ্র করে নাম ও স্বাক্ষর নকলের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল ও জাকসু নেতা দাবি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ বা সম্মতি ছাড়াই যৌথ বিবৃতিতে তাঁদের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল ও জাকসু নেতৃবৃন্দের যৌথ স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতিতে ড. নাহরিন ইসলাম খানকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ জানানো হয়।
বিবৃতিতে জাকসু ও হল সংসদের ভিপি-জিএস এবং সাবেক ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দসহ ৩১ জনের বেশি নেতার নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে বলে জানানো হয়। তবে বিবৃতিতে নিজের নাম ও স্বাক্ষর থাকার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতা।
জাবি ছাত্রদলের সাবেক নেতা ও মীর মশাররফ হোসেন হলের সাবেক ভিপি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “আমার নামটা কে দিলো? আমি তো জানি না। আমার সঙ্গে কেউ কথা বলেনি।”
নামের পাশে স্বাক্ষর ব্যবহারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এটা ভুয়া স্বাক্ষর। নাম না হয় অনুমতি ছাড়া দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু নামের পাশে স্বাক্ষরও বসিয়ে দিয়েছে, এটা কোন ধরনের আচরণ?”
জাবির আরেক সাবেক ছাত্রদল নেতা ও মীর মশাররফ হোসেন হলের সাবেক জিএস ড. ফারুক আহম্মদ শিপন বলেন, “এখানে যে সিগনেচার রয়েছে, তার ব্যাপারে আমি অবগত নই। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট, মিথ্যা ও ভুয়া। নাম ও স্বাক্ষর নকল করে বসানো হয়েছে।”
এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও চারজন সাবেক ছাত্রদল নেতাও দাবি করেছেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়া ওই বিবৃতিতে নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।
ভুয়া সাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ড. নাহরিন ইসলাম খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পরিবেশগত শাসন’ বিষয়ে মাস্টার্স এবং মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘যোগাযোগ ও উদ্ভাবন’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ ও গবেষণা অনুদান পেয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ড. নাহরিন একটি জাতীয়তাবাদী পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা এন আই খান বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি জাহানারা ইমাম হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ড. নাহরিন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। জাকসু নির্বাচনে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের প্রতিবাদে যে তিনজন শিক্ষক তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ ও নির্বাচন বর্জন করেছিলেন, তিনি তাঁদের একজন। পাশাপাশি কলাম লেখক ও টেলিভিশন আলোচক হিসেবে তিনি সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিয়ে আসছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ড. নাহরিন ইসলাম খানকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য হিসেবে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখবে। এ কারণে তাঁকে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনীত করার আহ্বান জানান স্বাক্ষরকারীরা।
অন্যদিকে, নাহরিন ইসলাম খানের পরিবর্তে অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনুকে সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনয়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাবি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ফোরামের সাবেক আহ্বায়ক ও জাকসুর সাবেক এজিএস আব্দুল আউয়াল মোল্লা।
তিনি বলেন, অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু ১৯৮৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে ফুলের তোড়া নিয়ে ছাত্রদলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের রাজনীতি শুরু করেন। তিনি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতা এবং জাকসুর নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেও জানান তিনি।
আব্দুল আউয়াল মোল্লা আরও বলেন, “গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী প্রশাসনের বিভিন্ন উপাচার্যের দুর্নীতি, নিপীড়ন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীনভাবে লড়াই করেছেন। সাম্প্রতিক জুলাই-২৪ আন্দোলনেও শিক্ষকদের মধ্য থেকে অন্যতম সংগঠক হিসেবে মাঠে থেকে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং ৫ আগস্ট ঢাকা অভিমুখী লং মার্চে নেতৃত্ব দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “তাই আমরা জাকসু এবং ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় ভিপি ও সাধারণ সম্পাদক পদধারীরা তাৎক্ষণিকভাবে উপাচার্যকে তাঁর জীবনবৃত্তান্তসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার স্বার্থে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করতে বলেছি।”
নাম-স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল আউয়াল মোল্লা বলেন, “এখানে কোনো পাল্টাপাল্টির ব্যাপার নেই। আমরা মনে করি, জাতীয়তাবাদী আদর্শের সবাই আমাদের সম্পদ। যোগ্যতার নিরিখে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি মাত্র।”
তিনি আরও বলেন, “যাদের নাম দুই জায়গায় দেখা যাচ্ছে, সেটি আমাদের বিব্রত করে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, কিছু সংখ্যক নাম আছে যাদের জিজ্ঞেসই করা হয়নি এবং অনেককেই বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে সম্মতি নেওয়া হয়েছে। তাই বিভ্রান্ত করে অথবা না জানিয়ে যদি কেউ নাম দিয়ে থাকে, সেটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ।”
উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য হিসেবে অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন ও অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানের নাম নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা চলছে।