সুপারি, পেয়ারা আর কাঠের শহর : পিরোজপুরে আধখানা দিন
বলতে গেলে হুট করেই যাত্রা। ইউসুফ ভাইয়ের মেসেজ পেয়ে পরদিন সকালেই রওনা হলাম পিরোজপুরের পথে। যদিও ঘুমের আড়ষ্টতা কাটাতে কাটাতে ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁইছুঁই। তবুও রূপাতলী থেকে বাসের জানালার পাশের সিটটি দখল করতে ভুল হয়নি।
জানালার পাশে বসার দুটি সুবিধা– এক দুর্ঘটনায় দ্রুত লাফিয়ে পড়া যায়, আর অন্যটি প্রকৃতির রূপসুধা পান করা যায়। বেলা ১১টায় যখন সিএ অফিস মোড়ে নামলাম, পিরোজপুরের স্নিগ্ধ বাতাস আমাকে স্বাগত জানাল।
শহর পেরিয়ে আমরা যখন গ্রামের মেঠো পথে বাইক নিয়ে ছুটছি, দুপাশে তখন সারিবদ্ধ সুপারি বাগান। জানলাম, এখানকার মিষ্টি সুপারি দেশের ২০টি জেলায় যায়। এমনকি রপ্তানি হয় ভারতেও। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো নেছারাবাদে সুপারির খোল দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র, যা আধুনিক যুগে এক অনন্য উদ্ভাবন।

পিরোজপুরের একটি সুপারির বাজার। ছবি : ঢাকা মনিটর ২৪
খালের দু’পাশে আমড়া আর সুপারির সারি পিরোজপুরকে যেন এক চিরসবুজ রূপ দিয়েছে। এখানকার মাটি এতটাই উর্বর যে কোনো রাসায়নিক সার ছাড়াই ফলে বিশাল আকারের সুস্বাদু আমড়া। প্রতি মৌসুমে শতকোটি টাকার আমড়া কেনাবেচা এ অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি মানেই বৈচিত্র্য। ভিমরুলি আর বৈঠাকাটার প্রতিদিনের ভাসমান বাজার যেন এক জীবন্ত জলছবি। যেখানে প্রতিদিন ভোরে পেয়ারা, আমড়া আর হরেক রকম তরি-তরকারির মেলা বসে। আবার সন্ধ্যায় নদীর তীরে অবস্থিত শতবর্ষী ভাসমান কাঠের বাজারটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম। সুন্দরী, মেহগনি আর রেইনট্রির বিশাল সমারোহ এখানে। এমনকি মঠবাড়িয়ার সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি ‘মমিন মসজিদ’ এই অঞ্চলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।

ভিমরুলি আর বৈঠাকাটার প্রতিদিনের ভাসমান বাজার। ছবি : ঢাকা মনিটর ২৪
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল একটি গ্রাম্য বিয়ে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমরা গেলাম সাঈদী ফাউন্ডেশনে। সেখানে আসরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ সময় কাটানো। এরপর পড়ন্ত বিকেলে আমাদের গন্তব্য হলো দৃষ্টিনন্দন বেকুটিয়া সেতু। বাংলাদেশ ও চীন মৈত্রীর স্মারক এই সেতু থেকে কঁচা নদীর ওপর দিয়ে বয়ে আসা মৃদু বাতাস সব ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছিল। পশ্চিম আকাশে যখন সূর্যটা রক্তিম আভা ছড়িয়ে বিদায় নিল, তখনই শেষ হলো আমার অর্ধদিবসের এই সংক্ষিপ্ত সফর।
মাগরিবের পর হালকা নাস্তা সেরে বরিশালের গাড়িতে উঠতে উঠতে মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ বাণী- “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া…”। আসলে আমাদের দেশটা কত সুন্দর, তা ঘরের কাছে এই পিরোজপুরে না এলে হয়তো অজানাই থেকে যেত।