ক্যাম্পাস থেকে কর্পোরেট জগতে: স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস সফরের দিনলিপি
সালটা ছিল ২০২৩। সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে। ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সিনিয়রদের মুখে দেশের অন্যতম সেরা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে একদিনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরের গল্প শুনতাম।
তিনটি সিনিয়র ব্যাচের বড় ভাই–আপুদের এই ট্যুরে যেতে দেখেছি, আর ফিরে এসে তাদের মুখে শোনা অভিজ্ঞতার গল্প আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করত। তখন থেকেই আমাদের ব্যাচেও এই ট্যুর নিয়ে এক ধরনের স্বপ্ন ও আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
সাধারণত তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শুরুতেই এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর হয়ে থাকে। তবে আমাদের ক্ষেত্রে ট্যুরটি হয়েছিল সেমিস্টারের শেষদিকে, তাই দিনটি আমাদের জন্য আরও বিশেষ হয়ে ওঠে।

গত ১৯ মে আমরা ফার্মেসি বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা স্কয়ার লাইফ সায়েন্স লিমিটেডে একদিনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে যাই। স্কয়ার কর্তৃপক্ষের আন্তরিকা, আতিথেয়তা এবং দক্ষ এক্সিকিউটিভদের দিকনির্দেশনায় পুরো সফরটি আমাদের জন্য ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও স্মরণীয়।
সময় গড়াতে থাকে। মার্চ মাসের শেষদিকে আমরা কয়েকজন সহপাঠী মিলে ড. শরিফুল হক স্যারের সঙ্গে ট্যুর নিয়ে আলোচনা করি। তিনি আমাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এরপর আশরাফুল ইসলাম স্যারের সাথে চিঠির খসড়া নিয়ে আলোচনা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল আমরা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি-এর জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাকশন) বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনপত্র জমা দিই।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষার সময়। যা কখনো ধৈর্যের পরীক্ষা, কখনো আবার আশার আলো। আব্দুল আলী ভূঁইয়া, সেলিম উদ্দিন ও সাব্বির স্যার নিয়মিত খোঁজ রাখছিলেন। ব্যাচের সবাই নোটিশ গ্রুপে প্রতিদিনই কোনো না কোনো আপডেটের অপেক্ষায় থাকত।
অবশেষে একদিন ফোন আসে ড. শরিফুল হক স্যারের কাছ থেকে। স্যার জানান স্কয়ার থেকে তেমাদের ট্যুরের অনুমোদন এসেছে। সেই মুহূর্তের পর যেন পুরো ব্যাচের ভেতর এক নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়। তাই, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার মাঝেই আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করি। সেখানে ব্যাচের সকল ছেলেরা মিলে বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে নিই যেখানে দ্বায়িত্বে থাকে ক্রেস্ট কমিটি (রেজা, অপু, ওয়াহিদ, মেহেদী, মারুফ)। ব্যানার কমিটি (ফরহাদ, ফিরোজ, রওনক এবং আমি)। আইডি কার্ড ও ফিতা কমিটি (রাশেদ, ইফতি, আবু বকর, তালহা)।
সবাই নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করছে, যেন এটি শুধু একটি ট্যুর নয়, বরং নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার একটি আয়োজন। আব্দুল আলী ভূঁইয়া স্যারের সহযোগিতায় ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশন থেকে ব্যানার ও ক্রেস্টের বাজেট নেওয়া হয়।

১৮ তারিখ রাতে ড. শরিফুল হক স্যারের সাথে শেষবারের মতো কথা বলে পরদিনের রওনা হওয়ার সময় নিশ্চিত করি। সকাল ৮:৪৫-এর মধ্যে সবাইকে ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। পরদিন সকাল ৯:২০ মিনিটে ক্যাম্পাস থেকে বাস ছাড়ে স্কয়ার লাইফ সায়েন্স লিমিটেডের উদ্দেশ্যে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ড. শরিফুল হক স্যার ও ড. ফয়সাল বিল্লাহ স্যার। বাস ছাড়ার মুহূর্ত থেকেই পুরো পরিবেশ আনন্দে ভরে ওঠে। সবাই যেন এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসে ভাসছিলাম। যাত্রাপথে স্যারদের সঙ্গে ছবি তোলা, সেলফি নেওয়া সব মিলিয়ে পরিবেশ ছিল প্রাণবন্ত।
সকাল ৯:৪৫ মিনিটে আমরা স্কয়ার লাইফ সায়েন্স লিমিটেডে পৌঁছাই। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই সামনে যে দৃশ্য দেখা গেল, তা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং আধুনিক অবকাঠামো দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন এক ইউরোপীয় মানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
রিসিপশন রুমে উষ্ণ অভ্যর্থনা, সকালের নাস্তা ও বড় স্ক্রিনে লেখা “Welcome Respected Teachers and Students from Pabna University of Science and Technology (PUST)” সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া।

এরপর শুরু হয় প্রকৃত শিক্ষা, ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট। দুই দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ উৎপাদনের জটিল ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া। ডিসপেনসিং, মিলিং, সিভিং, মিক্সিং প্রতিটি ধাপ যেন পাঠ্যবইয়ের পাতাকে জীবন্ত করে তোলে। যে বিষয়গুলো এতদিন শুধু পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো বাস্তবে দেখে অনেকের চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠে।
আমরা দেখলাম কিভাবে ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল তৈরী হচ্ছে। একই সঙ্গে দেখেছি কোয়ালিটি কন্ট্রোল (QC), কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স (QA) এবং আধুনিক ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থাপনা যা পুরো শিল্প ব্যবস্থার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে।
দুপুরে পরিবেশিত হয় মধ্যাহ্নভোজ। খাবারের আয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং আন্তরিক আতিথেয়তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এরপর সেমিনার রুমে শুরু হয় অনুপ্রেরণামূলক পর্ব। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ. চৌধুরী ও তার সহধর্মিণীর জীবন ও সংগ্রামের উপর ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়, যা পুরো হলরুমকে এক মুহূর্তে নীরব করে দেয়।
এরপর কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা ক্যারিয়ার গঠন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং করপোরেট জীবনের বাস্তবতা নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন। বিশেষভাবে জাপানিজ “IKIGAI” ধারণা অনেক শিক্ষার্থীর চিন্তায় নতুন আলো জ্বালায় নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার এক গভীর উপলব্ধি।

সেমিনার শেষে সবাই বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন সবাই ছবি তোলা ও স্মৃতি ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে দিনটি ছিল শেখা, দেখা ও অনুভবের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও আতিথেয়তা আমাদের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।
এই সফর শুধু একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিট ছিল না। এটি ছিল বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষাজীবনের এক সেতুবন্ধন। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে কাটানো সেই একটি দিন আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় করেছে। সেই দিনটি আমার জীবনের স্মরণীয় একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে চিরকাল।