জাবির ধর্ষণচেষ্টাপ্রক্টর বদলালেও বদলায়নি পরিস্থিতি, ছয় দফায় নেই দৃশ্যমান পদক্ষেপ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের প্রায় তিন মাস পরও আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির অধিকাংশের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি। দাবিগুলোর ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানালেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। এদিকে নতুন করে কোনো কর্মসূচিও এখনো ঘোষণা করতে পারেনি তারা।

গত ১২ মে রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হলসংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে পরদিন থেকেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনকারীরা প্রক্টর কার্যালয়ে তালা দেওয়া, প্রশাসনিক ভবন অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

আন্দোলনকারীদের ছয় দফার মধ্যে ছিল- অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, দায় স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ, ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, জরুরি হটলাইন ও কুইক রেসপন্স টিম চালু, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার এবং সাইবার নিপীড়ন প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন।

তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এসব দাবির অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় তারা হতাশ।

আন্দোলনকারীদের অন্যতম নাজিহা নাওয়ার বলেন, প্রথম দাবি হিসেবে তারা অভিযুক্তের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্মারকলিপি বা অন্য কোনো ফরম্যাটে সেখানে যাওয়ার পর পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রক্টর অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে মামলার অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন।

প্রক্টরের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, তারা এ ঘটনায় কাজ করছে এবং এরই মধ্যে কয়েকজনকে আটকও করেছে। তবে এখনো মূল অভিযুক্তকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে আন্দোলনকারীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং নিপীড়নের ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে কুইক রেসপন্স টিম গঠন। এ বিষয়ে প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান প্রক্টর।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির ভিত্তিতে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সার্কুলারও দেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। একইভাবে কুইক রেসপন্স টিম গঠনের বিষয়েও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে।

তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের জন্য সার্কুলার দেওয়া হলেও এখনো তাদের ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয়নি। ফলে এ দাবিকে তারা পূর্ণ বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন না।

প্রক্টরিয়াল বডি নিয়ে আন্দোলনকারীদের দ্বিতীয় দাবির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আন্দোলনের পর তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম পদত্যাগ করেন। এরপর দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন নতুন প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, নতুন প্রক্টর দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি তারা দেখতে পাচ্ছেন না।

নাজিহা নাওয়ার বলেন, নতুন প্রক্টরকে নিয়ে আপাতত বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রক্টরকে সহজে পাওয়া না যাওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানান তিনি।

এদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না আসার বিষয়ে নাজিহা নাওয়ার বলেন, আন্দোলনকারীদের কয়েকজন অসুস্থ এবং অনেকের একাডেমিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সময় সামনে চলে আসায় আপাতত কিছুটা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন তারা। এ কারণে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।

তবে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, বাকি দাবিগুলোকে তারা কোনোভাবেই কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের কার্যক্রম চালু রাখা হবে।

ফলে মে মাসে যে ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে জাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, প্রায় তিন মাস পরও তার অধিকাংশ দাবি বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং প্রধান দাবিগুলোর অগ্রগতি নিয়েই এখন প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীরা নতুন করে কী কর্মসূচি নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।