সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রথমবারের মতো সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘কারাম উৎসব’ পালিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মুক্তমঞ্চে দুই দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত সমতলের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে একটি আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি প্রশাসনিক ভবন প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়।
এতে ঢাক-ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ওঁরাও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী ও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে আসা ওঁরাও সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শোভাযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা শামিল হন।
শোভাযাত্রাটি শেষে ওঁরাও সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী উলুধ্বনি ও প্রদীপ জ্বালিয়ে উপাচার্যসহ অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়। বরণ পর্ব শেষে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে একটি ‘কারাম’ বৃক্ষের চারা রোপণ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।
এসময় অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ওঁরাও সম্প্রদায় অসামান্য পরিশ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে এই সম্প্রদায় অনেক পিছিয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, তাই প্রতিটি সন্তানকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে, যাতে সর্বক্ষেত্রে তাদের পদচারণা নিশ্চিত হয়। নিজেদের কখনো প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন ভাবলে চলবে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও যোগ্যতার শক্তিতে সমাজ ও দেশের মূলধারায় নিজেদের মেলে ধরতে হবে।
কারাম উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি শীত কুমার উরাং (খাঁখাঁ) এই আয়োজন নিয়ে বলেন, মাঠ থেকে ফসল তোলার পর সৃষ্টিকর্তা ও পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং আগামী মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় কারাম দেবতার পূজা করা হয়। এই উৎসবের বিশেষ রীতি হলো, উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ নিজেদের খরচের জন্য রেখে বাকি দুই-তৃতীয়াংশ প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা।
এর আগে গতকাল উৎসবের প্রথম দিনে ধর্মীয় আচার মেনে কারাম গাছের ডাল কেটে এনে অস্থায়ী বেদিতে স্থাপন করে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। রাতে সেই বেদির চারপাশে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গানের আসর বসে। আজ বিকেলে জলাশয়ে কারাম ডাল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুদিনব্যাপী এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
উল্লেখ্য, ‘কারাম’ মূলত ওঁরাও সম্প্রদায়সহ সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব। ভাদ্র মাসে কৃষি ও প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এই পরব পালিত হয়। প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে কারাম গাছের পূজা করে ফসলের সুরক্ষা, পরিবারের সুখ-শান্তি এবং ভাই-বোনের মঙ্গল কামনা করা হয়।