কেপ ভার্দের চমক থামিয়ে শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনা
নাটকীয়তা, রোমাঞ্চ আর শেষ মুহূর্তের থ্রিলার— কী ছিল না আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে ম্যাচে! মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী যেন উপভোগ করলেন একদম পয়সা উসুল করা এক ফুটবল দ্বৈরথ। প্রথমার্ধের কিছুটা গতিহীন ফুটবলে দ্বিতীয়ার্ধ আসতেই যেন প্রাণ ফিরল। বিশ্বমঞ্চের নবাগত দল কেপ ভার্দে এদিন যে অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ ও চমক দেখাল, তা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের রুখে দিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়া, পিছিয়ে পড়েও দু-দুবার সমতায় ফেরা—সব মিলিয়ে বীরোচিত লড়াই করেও শেষটা রঙিন হলো না কেপ ভার্দের। দিনেই বোর্জেসের আত্মঘাতী গোলে তাদের বিদায় নিতে হলো। আর ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা।
বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার (৪ জুলাই) ভোর ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের শেষ ৩২-এর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। মাঠের লড়াইয়ে বল দখলের দিক থেকে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই এগিয়ে থাকলেও কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণভাগের কারণে বেশিভাগ সময় বল ঘুরপাক খেয়েছে মাঝমাঠেই।
ম্যাচের শুরু থেকে আর্জেন্টিনা আক্রমণের জাল বোনার চেষ্টা করলেও নবাগত কেপ ভার্দে সুযোগ পেলেই বিপজ্জনক কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার চেষ্টা করছিল। এর মাঝেই ম্যাচের ২৯তম মিনিটে আসে আলবিসেলেস্তেদের কাঙ্ক্ষিত সেই ক্ষণ। মাঝমাঠ থেকে চমৎকার গতিময় পাসিং মুভে বল নিয়ে কেপ ভার্দের বক্সের সামনে চলে আসে আর্জেন্টিনা।
সেখানে বল পেয়েই নিজের চেনা বাঁ পায়ের এক জাদুকরী ও নিয়ন্ত্রিত শটে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বলটি গোলকিপারের ডান পাশ ঘেঁষে জালে জড়ালে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
গোলের পর প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আর্জেন্টিনা ডান দিক থেকে একাধিক ক্রস ও দূরপাল্লার শটে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা করলেও আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-০ স্কোরে বিরতিতে যায় দুই দল।
বিরতি থেকে ফিরে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। ৫২তম মিনিটে মেসির বাড়ানো লং বল বক্সে পেয়েও নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টার। ঠিক পরের মিনিটেই প্রতিআক্রমণে ওঠে কেপ ভার্দে। ডেরয় দুয়ার্তের এক দূরপাল্লার জোরালো শট দুর্দান্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করেন আর্জেন্টাইন বাজপাখি এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
তবে আলবিসেলেস্তেদের সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে সমতা ফেরায় কেপ ভার্দে। বক্সের ডানপ্রান্ত দিয়ে রায়ান মেন্ডিস ও ডেরয় দুয়ার্তের চমৎকার ওয়ান-টু-ওয়ান পাসিংয়ের পর রায়ানের ডিফেন্স চেরা পাসে বল পান দুয়ার্তে। এবার আর কোনো ভুল না করে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি।
সমতায় ফেরার পর কেপ ভার্দের গোলপোস্টের নিচে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান তাদের কিপার ভোজিনহা। ৭১তম মিনিটে মেসির বিপজ্জনক ফ্রি-কিক এবং যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের গতিময় বাঁকানো শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় গ্লাভসবন্দি করেন ভোজিনহা। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে মেসির নেওয়া এক নিচু ফ্রি-কিক ও তাঁর ফিরতি হেডারও দারুণ চতুরতায় আটকে দিয়ে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে যান এই কেপ ভার্দে তারকা।
নির্ধারিত সময়ের ১-১ সমতা ভাঙতে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে, যেখানে শুরুতেই রূপ নেয় আসল থ্রিলার। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিটে) ম্যাক অ্যালিস্টারের নিখুঁত পাস ধরে বক্সের ভেতর ঢুকে চমৎকার ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ।
আর্জেন্টিনার সেই বন্য উল্লাস ১০৩তম মিনিটে স্রেফ মাটি করে দেয় কেপ ভার্দে। ডানপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে ডি-বক্সের কিছুটা দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শটে দূরের পোস্ট দিয়ে আর্জেন্টিনার জাল কাঁপান কাবরাল। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ পুরো শরীর বাতাসে ভাসিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও বলের নাগাল পাননি। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল পুরো ম্যাচের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন গোল (২-২)।
ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ১১০তম মিনিটে কর্নারের বিনিময়ে আর্জেন্টিনার একটি বিপজ্জনক আক্রমণ থামায় কেপ ভার্দে। ডানপ্রান্ত থেকে লিওনেল মেসির নেওয়া সেই বিষাক্ত কর্নার কিকটি গিয়ে পড়ে সরাসরি ছয়গজ বক্সের ভেতর। সেখানে জটলার মধ্যে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে দুর্ভাগ্যবশত হেডে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন কেপ ভার্দের দিনেই বোর্জেস।
এই আত্মঘাতী গোলের সুবাদে ম্যাচে তৃতীয়বারের মতো ৩-২ ব্যবধানের লিড পায় আর্জেন্টিনা। বাকি সময়ে কেপ ভার্দে গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ করলেও আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ভাঙতে পারেনি। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো আর্জেন্টিনা শিবির।
