ভবিষ্যতে জামায়াত ক্ষমতায় এলে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দলীয়করণ ঘটবে: রিজভী

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি পশ্চাৎমুখী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করেছে, যা রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।

রোববার (২ আগষ্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কতৃক আয়োজিত জুলাই রক্তাক্ত: স্বরণ ও প্রত্যায় শীর্ষক আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি।

এসময় তিনি আরও বলেন, “যারা তরুণ রাজনীতি করেন, তাদের চিন্তা-ভাবনা হওয়া উচিত প্রগতিশীল ও অগ্রগামী। দেশকে নতুন কিছু দেওয়ার প্রত্যয় থেকেই তরুণদের রাজনীতি করা উচিত। কিন্তু আপনারা একটি পশ্চাৎমুখী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করেছেন। রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকেও এটি সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।”

রিজভী বলেন, “শেখ হাসিনা মনে করেছিলেন গুলি চালিয়ে, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে তিনি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবেন। কিন্তু তিনি এ দেশের মানুষের সাহস ও বীরত্বের ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে পারেননি। ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালিয়েছেন। ক্ষমতার জন্য নিজের দেশের মানুষের রক্তের ওপর দিয়েও হাঁটতে তার দ্বিধা ছিল না।”

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির এই নেতা বলেন, “জুলাই বিপ্লব ১৭ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তার দৃঢ় অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা তাকে বিচ্যুত করতে পারেননি।”

প্রশাসনে দলীয় নিয়োগ নিয়ে রিজভী বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন সরকার নিজেদের লোক নিয়োগ দেয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও প্রচলিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়েলস সিস্টেম’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, “সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হাজার হাজার পদে নতুন নিয়োগ হয়। এটি বেআইনি নয়।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “ভবিষ্যতে জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দলীয়করণ ঘটবে।”

বক্তব্যের একপর্যায়ে রাজনৈতিক ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েও মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালাতেন। আমরা তাকে ফ্যাসিস্ট ও খুনি বলেছি, কিন্তু কখনো অশালীন ভাষা ব্যবহার করিনি। এখন কিছু তরুণ নেতার বক্তব্যে যে ভাষা দেখা যাচ্ছে, তা গণতন্ত্র, সভ্যতা কিংবা উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সহায়ক নয়। এই ভাষা শেখ হাসিনার অপসংস্কৃতিরই প্রতিফলন।”

তিনি আরও বলেন, “সমাজে ঘৃণার রাজনীতি করে কেউ টিকে থাকতে পারে না। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার পরাজয় হয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের উচিত সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।”

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন নাসির শিবিরের সমালোচনা করে বলেন, “গত মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে ছাত্রশিবিরের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা পড়ে হল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। একইভাবে শহীদুল্লাহ হলের ছাত্রশিবিরের নির্বাচিত জিএসের কক্ষেও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বহিষ্কার করে। এ ঘটনার জেরে হলের এক হাউস টিউটর লজ্জায় পদত্যাগ করেন।”

নাসির উদ্দিন নাসির আরও বলেন, “গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির নারীদের হেনস্তা ও সাইবার বুলিং করে আসছে। অথচ এখন তারা নারী সুরক্ষার কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আলাদা ‘ফিমেল কর্নার’ চালু করেছে, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যারা বিকৃত রুচির পরিচয় দিয়ে ছেলেদের হলে দিনের পর দিন অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।”

এ সময় তিনি এনসিপির নেতা নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী ধারাবাহিকভাবে দেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে তির্যক ও অশালীন মন্তব্য করে আসছেন। তার বক্তব্যের জবাব দেওয়ার রুচি আমাদের নেই। তাকে অবিলম্বে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে তিনি সুশিক্ষা গ্রহণ করে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারেন।”

রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “দুঃখজনকভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন একজন ব্যক্তিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। যিনি পলিসি মেকিংয়ে কাজ না করে, বেলচা দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে ভয় দেখাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন। এরকম যদি আর একবার দুইবার হুমকি আপনি দিতে থাকেন, তাহলে জনতা একসময় আপনাকে এমন মারবে যে, আর পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না।”

আলোচনা সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, মহানগর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।