ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতি আসক্তি, চক্ষু হাসপাতালে বাড়ছে শিশুরোগী
একটা সময় রূপকথার গল্প শুনিয়ে বা ছড়া কেটে শিশুদের খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানো হলেও প্রযুক্তির এই যুগে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন ছোট্ট সোনামনিদের শান্ত করতে বা খাওয়ানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা নানা রঙের ইলেকট্রনিক ডিভাইস।
এর ফলে ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি শিশুদের আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে। বিশেষ করে চিকিৎসকদের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে শিশুদের ক্রমবর্ধমান চোখের নানা সমস্যা।
খেলাধুলার মাঠের স্বল্পতা এবং ব্যস্ত অভিভাবকদের কারণে শহুরে শিশুদের ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। আর এই একঘেয়েমি কাটাতে সঙ্গী হচ্ছে মোবাইল ফোন। শুধু শহর নয়, এখন গ্রামগঞ্জেও স্কুলপড়ুয়া সন্তানদের বায়না মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে অভিভাবকদের। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করেও দামি স্মার্টফোন কিনে দিতে হচ্ছে মা-বাবাকে।
আরও পড়ুন : হতাশা ও দুঃসময় দূর করার ১০টি শক্তিশালী দোয়া
ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিশ্বের প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু। আর বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশেও ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকছে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা চাকরিজীবী আবুল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাচ্চার সকালটাই শুরু হয় মোবাইল দিয়ে। এটা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। হাত থেকে ফোন নিলেই সে কান্নাকাটি শুরু করে, ঠিকমতো খেতে চায় না। বাইরে খেলার জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়েই তাকে ফোন দিতে হচ্ছে।’
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী মামান হোসেনের ভাষ্য, ‘খাওয়ার সময় কিংবা ঘুমানোর আগে—সব সময়ই স্ক্রিনে চোখ থাকে। দেখতে ভালো লাগে বলেই গেমস খেলি বা ফেসবুক চালাই।’
মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফের বাবা খাইরুল ইসলাম জানান, ‘মোবাইলের কারণে ছেলের স্বাভাবিক রুটিন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। রাত জাগা এবং সকালে দেরিতে ওঠার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এমনকি পড়ার বাহানা করেও সারাক্ষণ মোবাইল হাতে রাখছে তারা।’
চিকিৎসকরা বলছেন, এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কোমলমতি শিশুদের মেধা ও কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ভিট্রিও রেটিনা সোসাইটির সহ-সভাপতি ডা. তারিক রেজা আলী জানান, অতিমাত্রায় ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শিশুরা চোখের নানা সমস্যায় ভুগছে। তাদের কাছে চোখ লাল হওয়া, জ্বালাপোড়া করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং ঘন ঘন পলক পড়ার মতো লক্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সময়মতো এই আসক্তি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে শিশুদের চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার বা ‘মায়োপিয়া’র মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা দূরের জিনিস ঝাপসা দেখতে শুরু করে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা জানান, একটানা কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা ছোট-বড় সবার জন্যই ক্ষতিকর, যা শিশুদের ক্ষেত্রে আরও বেশি বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক ভাবেন শিশুদের চোখের সমস্যা হয় না, ফলে নিয়মিত চোখ পরীক্ষাও করান না। এতে সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে। বর্তমানে মাথাব্যথা ও চোখের নানা জটিলতা নিয়ে প্রচুর শিশু হাসপাতালে আসছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র : বাসস