বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা: আন্দোলনের শক্তি, নেতৃত্বেরও দাবিদার…
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক মোড়ে শিক্ষার্থীরা জাতির পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মপ্রকাশ। যার ধারাবাহিকতায় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে দেশে ১১৬টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ধারাবাহিক ভূমিকা রাখার পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কি জাতীয় নেতৃত্বের কাঠামোয় তাদের প্রাপ্য স্থান ও স্বীকৃতি পাচ্ছে?
একসময় ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রধানত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। আন্দোলনের মাঠ কিংবা উচ্চশিক্ষা—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, করপোরেট খাত, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ছাত্ররাজনীতিতেও তাদের গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
গত এক দশকের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের বড় বড় আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তারা মেধা ও সমঅধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তারা নাগরিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষাগত ও জাতীয় ইস্যুতেও তাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু সমর্থনই দেয়নি; তারা মাঠে ছিল, সংগঠিত ছিল এবং পরিবর্তনের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেকে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েছে, হয়রানির শিকার হয়েছে, একাডেমিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলনের মতো এখানেও তরুণদের সাহস ও অংশগ্রহণ পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সেমিনার, মতবিনিময় সভা এবং শিক্ষার্থী সমাবেশে অংশ নিয়ে একটি বিষয় বারবার শুনেছি—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, তারা কি কেবল কর্মী হিসেবেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেও জায়গা করে নিতে পারবে?
বর্তমান বিশ্বে নেতৃত্বের ধারণাও বদলেছে। শুধু বক্তৃতা বা সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নয়; প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা, নীতি বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা এবং বহুমাত্রিক চিন্তাশক্তিও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করছে। ফলে জাতীয় নেতৃত্বের পরিসরে তাদের অংশগ্রহণ দেশের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে।
বাস্তবতা হলো—নেতৃত্ব কখনো দান করা যায় না; নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়। কিন্তু সেই অর্জনের সুযোগ ও পথটিও উন্মুক্ত থাকতে হয়। একজন তরুণ কর্মী যদি বিশ্বাস করেন যে, তার মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও যোগ্যতা একদিন স্বীকৃতি পাবে, তাহলে তার কর্মস্পৃহা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে যদি তিনি মনে করেন যে, নির্দিষ্ট একটি সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, তাহলে হতাশা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও নেতৃত্বকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আধুনিক ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হলে দেশের বৃহৎ শিক্ষার্থী জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর প্রান্তিক কোনো বাস্তবতা নয়; তারা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় শক্তি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় উৎস।
যারা সংকটের সময় দায়িত্ব পালন করে, পরিবর্তনের সময় ভূমিকা রাখে এবং সংগ্রামের মুহূর্তে সাহস দেখায়, ভবিষ্যতের নেতৃত্বেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি আজ একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সেই বাস্তবতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান, সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। আন্দোলনের রাজপথে যাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান, নেতৃত্বের পরিসরেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সেটি শুধু একটি গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং পুরো ছাত্ররাজনীতির জন্যই একটি ইতিবাচক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হবে।
জুনাইদ আবু বকর সিদ্দিকী
প্রচার সম্পাদক (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদা)
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় কমিটি
