রাজশাহীতে মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই নেই প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের। সবুজ নগরী হিসেবে পরিচিত এই নগরীতে ১০৪টি বস্তিতে ৩২ হাজার ৫০০ পরিবারের বসবাস।
টিন ও প্লাস্টিকের ঝুপড়ি ঘরে তীব্র গরমে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে তাঁদের জীবন। বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে উচ্ছেদের ভয়। এ ক্ষেত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তুলনায় রাজশাহী পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিশ্ব নগর দিবস উপলক্ষে রাজশাহী মহানগরীরর একটি সেমিনার হলে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। ‘নগরের পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ প্রতিপাদ্যে টেকসই নগর উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক অধিকার নিয়ে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়
নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে সংলাপে সঞ্চালনা করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান। মূল প্রবন্ধ ও গবেষণা উপস্থাপন করেন বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহী নগরীর বস্তিগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলের তীব্র তাপপ্রবাহে টিন ও প্লাস্টিকের ঘরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আইনি ভূমিস্বত্ব না থাকায় তাঁদের সব সময় উচ্ছেদের আশঙ্কায় থাকতে হয়। সবুজ নগরী গড়ার উদ্যোগের সঙ্গে বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, চওড়া সড়ক ও আধুনিক অবকাঠামো থাকলেই একটি নগর সুন্দর হয়ে ওঠে না। নগরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যখন চরম মানবিক সংকটে থাকেন, তখন উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না। আবাসন নীতিমালায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রুলফাউ উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, জলবায়ুর অভিঘাত, খরা ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত অনেক মানুষ রাজশাহী শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য আইনি ভূমিস্বত্ব কিংবা সামাজিক আবাসনের কার্যকর সরকারি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, বস্তিবাসীদের জীবন কাটে উচ্ছেদ আতঙ্কে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বস্তির উন্নয়ন ও পুনর্বাসনে কিছু আইনি ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ থাকলেও রাজশাহীতে তাঁরা নাগরিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছেন
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাকিবুর রহমান বলেন, বস্তি এলাকার পরিবেশগত মানোন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আবাসনের বিষয়গুলো আগামী নগর পরিকল্পনায় যুক্ত করার কাজ চলছে। অন্যদিকে, রাজশাহী গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহিদুর রহমান সরকারি খাসজমি ও বাজেট ব্যবস্থাপনার আওতায় সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।
গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, তীব্র গরমে টিন ও প্লাস্টিকের ঘরে বসবাস করা বস্তিবাসীদের জন্য কষ্টকর। প্রকৃত সবুজ নগরী গড়তে হলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
নিজেদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে নামোভদ্রা বস্তির বাসিন্দা ওবিয়া বেগম ও বুধপাড়া বস্তির জাহেদা খাতুন বলেন, গরমের দিনে ঘরে থাকা যায় না। পানির সংকটের পাশাপাশি পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। উচ্ছেদের ভয় থেকে মুক্তি দিয়ে তাঁদের স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সংলাপ থেকে বস্তিবাসীর আবাসন সংকট মোকাবিলায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানানো হয়। সরকারি খাসজমিতে উচ্ছেদ না করে বসতি এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সিটি করপোরেশন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও নাগরিকদের সমন্বয়ে আবাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন এবং বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসনে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার দাবি জানান বক্তারা।