মিউজিক হলো অন্তরের মদ
মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমরা অধিকাংশ মানুষই কোনো একটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করে দেখিনা, বাহ্যিক রূপ দেখেই বিচার করে ফেলি। কোনগুলো ভালো আর কোনগুলো মন্দ, সে ব্যাপারে যেনো আমাদের কোনো মাথা ব্যাথাই নেই।
‘মিউজিক’ বর্তমান বিশ্বে নেশার মতো ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সমাজে। আজ বহু মুসলিম ছেলেমেয়ে এই মিউজিকের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ইসলামের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হালাল কি হারাম? ইসলামে এর অবস্থান কোথায়? সে ব্যাপারে যেনো কারোর কোনো জানার ইচ্ছেই নেই।
মিউজিকের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? এটা হালাল নাকি হারাম? সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ। আলোচনার শুরুতেই বলে রাখছি আমাদের মুসলমানদের চূড়ান্ত দলিল হলো- কুরআন ও সুন্নাহ। ইসলামের এই দুই মৌলিক দলিল থেকেই আলোচনার চেষ্টা করছি।
আরও পড়ুন- টাকা আর ট্রেন্ডের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিত্ব
বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু সম্প্রদায় অবশ্যই জন্ম নিবে যারা ব্যভিচার, সিল্কের কাপড়, মদ্যপান ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৯০)
ইবনু আববাস (রা.) বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মদ, জুয়া ও সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’ (মিশকাত, হাদিস ৪৫০৩)
আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেছেন, ‘আর এক শ্রেণির লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল তামাশার বস্তু (গান-বাজনা) ক্রয় করে আর আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ওদের জন্যই আছে অবমাননাকর শাস্তি।’ (সূরা লুকমান, আয়াত ৬)
সূরা লুকমানের এই আয়াতের ব্যখ্যায় বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরি (রাহ.) ইবনে তাফসীরে ইবনে বাসীরে বলেন, এই আয়াতটি গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। যা বান্দাকে কুরআন থেকে গাফেল করে দেয়। (তাফসীরে ইবনে বাসীর ৩/৪৪১)
কুরআন মাজীদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিশ শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজী পেশ করে। তখন আল্লাহ তায়ালা ইবলিশকে বললেন, ‘আর তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো পদস্খলিত কর….. আর তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দাও। আর শয়তান ছলনা ছাড়া তাদেরকে কোন প্রতিশ্রুতিই দেয় না।’ (সূরা ইসরার ৬৪ আয়াতের খণ্ডাংশ)
যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিশের আওয়াজ। ইবলিশের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকেই বোঝানো হয়েছে। আমি বলছি না যে, ইসলামে সব গান শোনা হারাম। একটা গান তখনই হারাম হবে, যখন ওই গানে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকবে। যখন গানের কথায় শরীয়ত বিরোধী বা শিরকী কোনো কথা থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আজকাল বেশিরভাগ গানের বিষয়বস্তুই হলো হারাম রিলেশনশিপ আর হারাম ভালোবাসা। বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজ এই নেশায় বেশি বুঁদ হয়ে পড়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বাদ্যযন্ত্র শুনে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তার বর্ণনা পাওয়া যায় বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফে’ রাহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত একটি হাদিসে। তিনি বলেন, একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ (বাঁশির) শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৪৫৩৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯২৪)
গান-বাজনা নিয়ে অন্য একটি হাদিসে পাওয়া যায়— আবু মালিক আশ‘আরী (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আমার কিছু উম্মত মদ পান করবে এবং তার নাম রাখবে ভিন্ন। তাদের নেতাদেরকে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সম্মান করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভুমিকম্পের মাধ্যমে মাটিতেই ধসিয়ে দিবেন। আর তাদেরকে বানর ও শুকুরে পরিণত করবেন। (বুখারী ও ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০২০)
হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত আরেকটি রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে, তখন তিনটি ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে। এই তিনটি বিপদ হলো- (১) বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ধসে যাবে। (২) উপর থেকে অথবা কোন জাতির পক্ষ থেকে যুলুম অত্যাচার চাপিয়ে দেওয়া হবে। এবং (৩) অনেকের পাপের দরুণ আকার-আকৃতি বিকৃত করা হবে।
মিউজিক হচ্ছে সাধারণ মানুষকে অবদমিত করে রাখার মাদক। মিউজিক মানুষের ইন্দ্রিয়গুলোতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। আধ্যাত্মিক উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং নৈতিকতাবোধকে ধ্বংস করে ছাড়ে। মনে রাখতে হবে, ‘মিউজিক হলো অন্তরের মদ’ তাই এটি থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। সেজন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মিউজিক থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিক।
লেখিকা: মুবাশ্বিরা তানজুম বুশরা
শিক্ষার্থী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি