লক্ষ্মীপুরে গাছে পেরেকঠুকে চলছে খামখেয়ালিপনা
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা শহরজুড়ে শতবর্ষী রেইনট্রি গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে পেরেকঠুকে ফেস্টুন লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালাচ্ছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিএনপি। অন্যসব দলেরও গাছে পেরেকঠোকা ফেস্টুন দেখা মিলছে পুরো শহর জুড়ে। এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাননি রায়পুর পৌর প্রশাসক মোঃ ইমরান খাঁন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ সচেতন ব্যাক্তিরা প্রতিবাদ জানালেও প্রশাসকের তরফ থেকে নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা। বিপরীতে সেসব প্রতিবাদকে নিরব ভূমিকায় থোড়াই কেয়ার করছেন পৌর প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন জাগছে, পেরেকঠুকে এ কেমন স্বার্থের খেলা চলছে? এ কেমন খামখেয়ালিপনা?
সারাদেশের মতো এই পেরেকঠোকা রাজনৈতিক কালচার যে রায়পুরের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে সেটি বুঝতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট পক্ষের কেউই। শুধু উপজেলা শহর নয়, কেরোয়া ইউপির জোড়পুল, মোল্লারহাট, বামনির বাংলা বাজার ও পশ্চিমের জনপদ হায়দরগঞ্জসহ পুরো উপজেলার একই হাল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ব্যানার আর ফেস্টুন টাঙিয়ে গাছের প্রাণ কেড়ে নিতে মরিয়া রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।
অথচ “গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান” এমন স্লোগানসহ যাবতীয় নির্দেশনা সরকারের তরফ থেকে থাকলেও যেন “গাছ নিধন করুন, পরিবেশের বারোটা বাজান” স্লোগান নিয়ে অঘোষিত যুদ্ধে নেমেছে স্থানীয় নেতা গোচের মানুষজন।
আরও পড়ুন- মিউজিক হলো অন্তরের মদ
গাছে পেরেকঠুকে গাছের বেঁচে থাকাকে হুমকির মুখে ফেলা নৈতিকতা বিবর্জিত এবং দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরদিকে দেদারসে এসব কার্যক্রম চলমান থাকলেও প্রশাসন নিচ্ছে না প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা। তার বিপরীতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে প্রশাসন— এমন আলোচনা আজ পরিণত হয়েছে টক অব দ্য রায়পুর অর টক অব দ্য টাউন টু লক্ষ্মীপুরে। যা টক অব দ্য কান্ট্রি হতে নেবে না বেশি সময়।

এভাবেই গাছে গাছে ঝুলছে ব্যানার আর ফেস্টুন। ছবি : জিহাদ হোসেন রাহাত
একে তো পেরেকঠুকে তিলে তিলে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সড়কের পাশের ছায়াদার গাছের প্রাণ তার ওপর ২০১৯ সাল থেকে চলছে অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষ নিধন কার্যক্রম। সরকারি সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়েও ছিলো চলমান। রায়পুর নতুন বাজারে সমন্বয়ক জুবায়ের আল ইয়াসিন ও তার বাবা হুট করেই কেটে নেন একটি শতবর্ষী রেইনট্রি। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্র পত্রিকায় প্রতিবাদের ঝড় উঠলে পৌর প্রশাসক ইমরান খাঁন জানান, ডাল কাটার অনুমতি দিলেও গাছ কেটে অন্যায় করেছেন তারা।
এ ঘটনার পরও থামেনি রায়পুরের কিছু অসাধু মানুষ। নানানভাবে সড়কের পাশে থাকা বৃক্ষ নিধন ও ক্ষতিতে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। আধুনিক এ যুগে এসেও অনলাইন প্রচারণার সুযোগ না নিয়ে দিচ্ছেন অফলাইনে গাছের বারোটা বাজিয়ে।
শুধু যে রাজনৈতিক ব্যানার, পোস্টার কিংবা ফেস্টুনে সয়লাব হয়ে নাজেহাল গাছের অবস্থা, তা কিন্তু নয়। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানাও বেছে নিচ্ছে একই পথ।
পাশাপাশি ডিস কেবল, ওয়াইফাই, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সার্ভিসের কেবলও টানা হচ্ছে এই গাছের সাথে বেঁধে। এতে করে গাছগুলোর দিকে তাকালে সবুজ পাতা কম, বেশি মিলছে- ক্যাবল, ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও চটকদার সব বিজ্ঞাপনী সামগ্রীর দেখা।
রায়পুর উপজেলার সীমানা পেরিয়ে জেলা সদরের সড়ক অংশে প্রবেশ করলেই এখন দেখা মেলে স্বচ্ছ আকাশের। অথচ গত বছর পাঁচেক আগেও মিলত রেইনট্রি গাছের পাতা ও ডালের দেখা। সিএনজি, বাস কিংবা অন্য যানবাহনে চড়লে আগে যেখানে গরম সহনীয় মনে হতো, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে এসে অসহনীয় তাপদহন করতে হচ্ছে সহ্য।
মহাদেবপুর, দালাল বাজার, ইটেরপুল, বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সড়কের পাশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শতবর্ষী গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে বহু আগে। যে ৫ শতাংশ গাছ অবশিষ্ট আছে সেগুলোও এখন বিজ্ঞাপনী খাম্বায় পরিণত হয়ে গেছে। শুধু রায়পুর নয়, জেলা সদর, রামগতি, কমলনগর, চন্দ্রগঞ্জ ও রামগঞ্জেও মিলবে একই দশার দেখা।
প্রচলিত আইন ও সরকারি শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরও যখন এমন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন বোঝার বাকি থাকে না, আইন যে তার চরিত্র হারিয়েছে। অথবা ধরে নিতে হবে, সরকার ও সংশ্লিষ্টরা অপরাধীদের কাছে জিম্মি। এমন অবস্থার উত্তরণ জরুরি।
লেখক-
জিহাদ হোসেন রাহাত
শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যাড মিডিয়া স্টাডিজ।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।