টাকা আর ট্রেন্ডের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিত্ব
পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের জীবনেই লক্ষ্য থাকে। কিন্তু লক্ষ্যগুলোর শেষ প্রান্তে গিয়ে যেন একটা জায়গায় সবাই মিলে যায়—অর্থ উপার্জন। জীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে মানুষ পৌঁছায় সেই অপরিহার্য সিদ্ধান্তে; বেঁচে থাকতে হলে অর্থ চাই। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিংবা আধুনিক জীবনের আরও অসংখ্য চাহিদা পূরণে অর্থ ছাড়া সবই যেন অর্থহীন।
অর্থ উপার্জনের এই অনিবার্য চাহিদাই গড়ে তুলেছে মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য। কেউ নিজের ব্যক্তিত্বকে অক্ষুণ্ণ রেখে স্বল্প উপার্জন হলেও তুষ্ট থাকেন। আবার কেউ ব্যক্তিত্ব, নীতি, আদর্শকে বিকিয়ে দিয়ে নেমে পড়েন উপার্জনের যুদ্ধে। তার কাছে অর্থই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য, জীবনের একমাত্র মাপকাঠি।
প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতায় উপার্জন এখন সহজ থেকে সহজতর হয়ে গিয়েছে। এক সময় শখের বসে খোলা ফেসবুক একাউন্টটি খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। চাইলেই শখের বসে কেনা স্মার্টফোনটি দিয়ে ভিডিও বানিয়ে আপলোড করে উপার্জন করা যায় সেখান থেকে। ছবি পোস্ট, কোনো কিছু লেখা কিংবা স্টোরি পোস্ট করেও কম-বেশি উপার্জন করা যায়।
আরও পড়ুন- মিউজিক হলো অন্তরের মদ
ফেসবুকের মাদার কোম্পানি মেটা’র সর্বশেষ আপডেট এই পথকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ফলাফল? প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার মধ্য দিয়ে অনেকেই এখন জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়াকে। বনে যাচ্ছেন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই সহজ উপার্জনের পথ আমাদের কী দিচ্ছে আর কী কেড়ে নিচ্ছে?
নিঃসন্দেহে, সোশ্যাল মিডিয়া অনেকের কাছে একটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। অনেক মানুষকে ঘরে বসে উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অনেকে লুকায়িত থাকা নিজের প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত করছেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। সেখান থেকে করছেন উপার্জন। কেউবা চাকরির পেছনে জুতোর সুখতলা ক্ষয় করে অবশেষে একটি গতি খুঁজে পাচ্ছেন ডিজিটাল দুনিয়ায়। চাকরির বাজারের হাহাকার ভুলে হয়ে উঠছেন আশার প্রদীপ, ধরছেন পরিবারের হাল। তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এক নতুন দিগন্ত।
প্রত্যেকটি জিনিসেরই দুটি দিক থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই দিকটি আলো ঝলমলে হলেও মুদ্রার অপর পিঠটি কালো কুৎসিত। যেখানে অর্থ উপার্জনের মোহে অনেকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা এবং সমাজিক দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিচ্ছেন। ভাইরাল হওয়ার আশায় কনটেন্টে যুক্ত করছেন চটকদার ও অনৈতিক সব উপাদান। লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের লোভে কেউ কেউ নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিচ্ছেন, অপরের গোপনীয়তার তোয়াক্কা না করেই ছড়িয়ে দিচ্ছেন ভিডিও।
আরও পড়ুন- লক্ষ্মীপুরে গাছে পেরেকঠুকে চলছে খামখেয়ালিপনা
এই ভাইরালের নেশা মানুষকে এতটাই পেয়ে বসেছে যে, মানবিকতাবোধ ভুলে মানুষ ছুটছে ভাইরালের নেশায়। রাস্তায় কোনো মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হলে এখন আর মানুষ তাকে উদ্ধার করতে যায় না। বরং ঝাপিয়ে পড়ে ভাইরাল যুদ্ধে, কার আগে কে লাইভে যাবে। পাশের বাসায় আগুন লাগলে নেভাতে নয় সেই আগুনে আলু সিদ্ধ খাওয়ার মতো লাইভ করতে যান। রাস্তায় কোনো দুষ্কৃতকারী কোনো মানুষকে মেরে ফেললেও প্রতিবাদের হাত নয়, আমাদের পকেট থেকে বের হয় মোবাইল।
আধুনিকতার এই দুনিয়ায় আপনি কেমন, তার একটি আইডেন্টিফিকেশন দেয় আপনার ফেসবুক ওয়াল। একজন ডাক্তার ওয়াল স্ক্রল করলে সেখানে ৭০-৮০ শতাংশ স্ট্যাটাস থাকে কোনো না কোনো ভাবে তার পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একইভাবে শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসন, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ সবার একই অবস্থা। কিন্তু ফেসবুক প্রোফাইলে উপার্জনের অবস্থা চালু করার পরে সেটি যেনো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখন ক্লাস রুমে গিয়ে পড়ানোর পরিবর্তে রিলস বানাতে দেখা যায় অনেক শিক্ষককে। বাকি পেশাগুলোর অবস্থাও একই।
সম্প্রতি বিড়ম্বনার এই তালিকায় যোগ হয়েছে ফলোয়ার্স আর হাইলাইটস৷ যত্রতত্র কোনো একটি পোস্ট করতে পারলেও, কমেন্ট সেকশনে চলে ফলোয়ার্স আর হাইলাইটসের অত্যাচার। সেই স্ট্যাটাসের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও আপনার নোটিফিকেশন ভরে যাবে সেই অত্যাচারে। অনেক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষও নেমে পড়েছেন অন্যকে অত্যাচার করার এই কর্মযজ্ঞে। একটি বারও চিন্তা করেন না যে অন্য মানুষগুলো বিরক্ত হচ্ছেন।
উপার্জন অবশ্যই জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেটি হওয়া উচিত পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সম্মানজনক একটি প্রক্রিয়ায়। সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমগুলোকে উপার্জনের জন্য ব্যবহার করা যেতেই পারে, তবে সেটি যেন হয় দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার সঙ্গে।
উপার্জনের দৌঁড়ে এগিয়ে যাওয়াটা খারাপ নয়। তবে সেটি যদি হয় নিজের নীতিকে পেছনে ফেলে, অন্যের ক্ষতি করে, অথবা নিজের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে—তবে সেটি কখনই টেকসই নয়, সম্মানজনকও নয়। অর্থ উপার্জনের এই প্রতিযোগিতায়, আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবনের শেষ সফলতাটা শুধু উপার্জনের অঙ্কে নয়, বরং সেটি নির্ধারিত হয় আমরা কতটা মানুষ থাকতে পেরেছি তার ওপর।
আজকের দিনে প্রয়োজন প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার। প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য যেখানে আমরা উপার্জন করব, তবে তাতে আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ থাকবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে হবে, কীভাবে এই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে হয়। সেই সঙ্গে কীভাবে প্রযুক্তির ক্ষতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়।
লেখক- মুহা. নাজমুল সাগর
সাংবাদিক