বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের নিয়ে হাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
“একটি সুঁই, একটি সুতো আর নতুন করে বাঁচার গল্প…”— এই স্লোগানকে সামনে রেখে বাল্যবিবাহের শিকার ও ঝরে পড়া নারীদের স্বাবলম্বী করতে এবং তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে নতুন করে ডানা মেলতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) একঝাঁক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী। তাদের এই সামাজিক উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুতোর কাব্য’।
উদ্যোক্তারা জানান, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং এর কুফল নিয়ে নানামুখী সচেতনতামূলক কাজ হলেও, যারা ইতিপূর্বেই বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে পড়ালেখা ছেড়ে সংসারী হতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের নিয়ে ভাবার মানুষ খুব কম।
তারা বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কারণে শত শত কিশোরীর অকাল স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একসময় হারিয়ে যায় তাদের নিজস্ব মেধা, শখ ও আহ্লাদ। ঠিক এই স্তরের নারীদের হাতের দক্ষতাকে শক্তিতে রূপ দিয়ে, তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যেই যাত্রা শুরু করেছে ‘সুতোর কাব্য’।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে কো-ফাউন্ডার হিসেবে কাজ করছেন হাবিপ্রবির পাঁচ শিক্ষার্থী— মো. ফয়সাল আলী, আরফিন জাহান স্বর্ণা, মিসকে জান্নাত, রিমু সোলায়মান এবং রিমন চৌধুরী।
উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে কো-ফাউন্ডাররা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আত্মনির্ভরতা মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, আত্মনির্ভরতা হলো নিজের ছোট ছোট ইচ্ছাগুলো নিজের সামর্থ্যে পূরণ করতে পারা এবং নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিচয়টা আবার খুঁজে পাওয়া। আমরা হয়তো রাতারাতি সবার জীবন বদলে দিতে পারব না, কিন্তু আমরা চাই অন্তত কিছু নারীর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে। তাদের তৈরি নান্দনিক হস্তশিল্পের সঠিক মূল্যায়ন এবং একটি টেকসই বাজার তৈরির মাধ্যমে আমরা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার মতো সক্ষম করে তুলতে চাই।
‘সুতোর কাব্য’ কেবল নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং একটি সচেতন, সুস্থ ও সবুজ সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক নিয়মিত সচেতনতামূলক সেমিনার ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই উদ্যোগের সাথে মিশে আছে একটি অনন্য সবুজ অঙ্গীকার।
পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ‘সুতোর কাব্য’-এর বিক্রিত প্রতিটি পণ্য থেকে ২ টাকা করে গাছ রোপণ কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। এছাড়াও, কোনো ক্রেতা ৩০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের পণ্য কিনলেই তাকে উপহার হিসেবে একটি করে গাছের চারা দেওয়া হবে, যাতে প্রতিটি ক্রয়ের মধ্য দিয়ে একটি সবুজ পৃথিবী গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন মানবিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
তরুণ এই উদ্যোক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ‘সুতোর কাব্য’ একদিন বাল্যবিবাহের শিকার অসংখ্য নারীর অন্ধকার জীবনে আশার আলো ছড়াবে এবং একটি টেকসই সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করবে।
