‘নতুন বাংলাদেশ’—বাস্তব পরিবর্তন, নাকি পুরোনো রাজনীতির নতুন মোড়ক?

‘নতুন বাংলাদেশ’—বাস্তব পরিবর্তন, নাকি পুরোনো রাজনীতির নতুন মোড়ক?
প্রতীকি ছবি

‘নতুন বাংলাদেশ’—বাস্তব পরিবর্তন, নাকি পুরোনো রাজনীতির নতুন মোড়ক?

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন বড় ধরনের পরিবর্তন এলো, তখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটি নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। রাজপথের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি, তরুণদের স্লোগান এবং নাগরিক সমাজের প্রত্যাশায় বারবার ফিরে এসেছিল একটি শব্দ—‘নতুন বাংলাদেশ’।

এই নতুন বাংলাদেশ কেবল একটি সরকারের পরিবর্তনের কথা বলেনি। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা—যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের বাইরে থাকবে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, প্রশাসন হবে জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকের অধিকার হবে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তী কয়েক মাসের বাস্তবতা সামনে আসার পর প্রশ্নটি এখন অন্য জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছি, নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে? অর্থাৎ, ‘নতুন বাংলাদেশ’ কি বাস্তব পরিবর্তনের নাম, নাকি পুরোনো রাজনীতির নতুন মোড়ক?

পরিবর্তন কি একেবারেই হয়নি?
না, এমন দাবি করাও বাস্তবসম্মত হবে না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের ভয় ও সংকোচের জায়গায় নাগরিকদের মধ্যে নিজেদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বেড়েছে। সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে ব্যাপক জনআলোচনা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন এবং তাদের সুপারিশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। পরে ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়।

গণভোটে ৬৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। এই রায়ের অর্থ শুধু কোনো একটি দল বা ব্যক্তির প্রতি সমর্থন নয়; এর মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশাও প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে—রাষ্ট্র কি সেই পরিবর্তনের জন্য নিজের কাঠামো বদলাতে প্রস্তুত?

ক্ষমতার পালাবদল আর রাষ্ট্রের পরিবর্তন এক নয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এক বিষয় নয়। একটি সরকার চলে যায়, আরেকটি সরকার আসে। মন্ত্রী বদলায়, সচিব বদলায়, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ আসে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা যদি একই থাকে, তাহলে পরিবর্তনটি মূলত সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—মানুষ শুধু শাসকের পরিবর্তন চায়নি; তারা ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতির পরিবর্তন চেয়েছিল। এই জায়গাতেই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি।

নিয়োগের প্রশ্নে পুরোনো বিতর্ক
সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ সবসময়ই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন উঠতে শুরু করলে স্বাভাবিকভাবেই পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে।

প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না—শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ? একজন যোগ্য কর্মকর্তা যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হওয়ার কারণে সুবিধা পান, কিংবা একজন যোগ্য ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পিছিয়ে পড়েন—তাহলে সেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয় না।

কারণ দলীয়করণ কেবল একটি দলের সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সংস্কৃতি। আর একটি সংস্কৃতি তখনই বদলায়, যখন ক্ষমতাসীন দল নিজের জন্যও সেই একই নিয়ম মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে, যা সে বিরোধী দলে থাকার সময় দাবি করেছিল।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি
রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিচারক নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছিল, সেগুলোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু ৯ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয়-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়টি নতুন বিতর্ক তৈরি করে। বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে বিল পাসের ফলে বিচারক নিয়োগের আগের ব্যবস্থায় ফেরার পাশাপাশি স্বতন্ত্র সচিবালয়ের ব্যবস্থাটিও বিলুপ্ত হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় সরকার বিশ্বাসী এবং অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের পর পরবর্তীতে আইন প্রণয়ন করা হবে। অন্তর্বর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন বিচারকের বৈধতাও বহাল রাখা হয়েছে।

সরকারের এই ব্যাখ্যা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও থাকা দরকার—সংস্কারের নামে যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটি বাতিল করে আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এখানে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেয়ে বরং প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তোলা বেশি জরুরি। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়। এটি নাগরিকের অধিকার।

গণভোটের রায় কি শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি?
গণভোটে ৬৮ দশমিক ২৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটকে যদি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে একটি জনমত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে—সেই রায়ের বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে?

ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ কিংবা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মতো সংস্কারের প্রশ্নগুলো মূলত একটি বিষয়কে সামনে আনে—ক্ষমতাকে কীভাবে সীমাবদ্ধ করা যায়?

এখানেই রাজনীতির সবচেয়ে পুরোনো দ্বন্দ্বটি সামনে আসে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর একই ক্ষমতার কাঠামো যখন তাদের হাতে আসে, তখন সেই ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে আগ্রহ অনেক সময় কমে যায়।

এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা এত দীর্ঘদিনের যে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল এবার অন্তত এই চক্রটি ভাঙবে। যদি তা না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—গণভোটে জনগণ কি শুধু একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দিয়েছে, নাকি নিজেদের ওপর ভবিষ্যৎ সরকারের ক্ষমতাও সীমিত করার একটি নির্দেশ দিয়েছে?

আইনশৃঙ্খলা: পরিবর্তনের আরেক কঠিন পরীক্ষা
একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। আর সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব জাস্টিস এবং পুলিশের ওপর হামলার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। একই সময়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জনের মৃত্যু এবং পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারের আপত্তিও রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, টিআইবির প্রতিবেদন কোনো স্বাধীন তদন্ত বা মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বা কাটিংনির্ভর।

সরকারের এই বক্তব্যও আলোচনায় থাকা জরুরি। কিন্তু পদ্ধতিগত বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকের আস্থা রাষ্ট্রের বৈধতার অন্যতম ভিত্তি।

একইভাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক কোন্দল ও সহিংসতায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩৭-৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হওয়ার তথ্যও রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিক সামনে আনে।

ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত, দখল বা আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ—এসব যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে শুধু সরকার পরিবর্তন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্পূর্ণ হয় না।

তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা শুধু কোনো একটি দলের মধ্যে নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো—রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলের সীমারেখা বহু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া।

ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের রাজনৈতিক শক্তির অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে সেই দুর্বল প্রতিষ্ঠানই উত্তরাধিকার হিসেবে পায়। তারপর তারাও একই কাঠামো ব্যবহার করে। এভাবেই তৈরি হয় একটি চক্র। দল বদলায়, ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতি বদলায় না।

এই কারণেই রাষ্ট্র সংস্কারকে কেবল আইন পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং ক্ষমতাসীনদের নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সবচেয়ে কঠিন সংস্কার সম্ভবত এখানেই। কারণ কোনো সরকারকে নিজের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার মতো সংস্কার করতে বলা মানে তাকে তার সবচেয়ে স্বাভাবিক রাজনৈতিক সুবিধাটিই ত্যাগ করতে বলা।

নতুন বাংলাদেশ আসলে কী?
‘নতুন বাংলাদেশ’ কোনো সরকারের নাম নয়। কোনো দলের নির্বাচনী স্লোগানও নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের ধারণা, যেখানে সরকার বদলালেও নাগরিকের মৌলিক অধিকার বদলাবে না; ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বদলালেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বদলাবে না; মন্ত্রী বদলালেও প্রশাসনের পেশাদারিত্ব বদলাবে না; বিরোধী দল বদলালেও সংসদীয় জবাবদিহি বদলাবে না।

একটি সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশে একজন নাগরিককে এই নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে যে, তার অধিকার কোনো দলের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সেই সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল। এখন সেই দরজা দিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে, সেটিই আসল পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সরকার নিয়ে নয় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ ছিল শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়; রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণের।

সেই সুযোগের কিছু ইতিবাচক ফল ইতোমধ্যে দেখা গেছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন করছে, প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে ভাবছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে যদি পুরোনো নিয়োগ সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল জবাবদিহি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কিংবা দলীয় আধিপত্যের প্রবণতা ফিরে আসে, তাহলে পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি অপূর্ণই থেকে যাবে। কারণ ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন খুব কমই ঘটে।

তাই ‘নতুন বাংলাদেশ’ নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো না—কারা ক্ষমতায়? প্রশ্নটি হওয়া উচিত— ক্ষমতায় যারা আছে, তারা কি আগের ক্ষমতাসীনদের মতো একইভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, নাকি তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে যেখানে আগামী দিনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, তাকে একই নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে?

যদি দ্বিতীয়টি সম্ভব হয়, তাহলেই বলা যাবে—চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার বদলায়নি, বাংলাদেশকে বদলানোর পথও তৈরি করেছে। আর যদি ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো প্রতিষ্ঠান, পুরোনো নিয়োগ সংস্কৃতি, পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতাই ফিরে আসে, তাহলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ কেবল নামেই নতুন থাকবে।

কারণ নতুন বাংলাদেশ কোনো নতুন সরকারের নাম নয়; নতুন বাংলাদেশ হলো পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতিকে অতিক্রম করার একটি প্রতিশ্রুতি।

হেডলাইন লাইন-ব্রেক (শব্দের মাঝে ↵ চাপুন)
প্রিফিক্স ও প্রতি লাইনের ফন্ট সাইজ ও কালার
লাইন স্পেসিং
--
হেডলাইনের পজিশন