২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আহনাফ : এক নক্ষত্রের পতন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ আবীর আশরাফুল্লাহ্। ৫ আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত তিনি।
শান্ত, বিনয়ী ও মেধাবী এক জীবন
আহনাফ ছোটবেলা থেকেই ছিল শান্তশিষ্ট ও চুপচাপ। বড় হয়েও সে ছিল ইন্ট্রোভার্ট, তবুও সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলত। হাতে গোনা কিছু বন্ধুর সাথে চলত বলে কারও সাথে তার কোনোদিন দ্বন্দ্ব হয়নি। তার বিনয় ছিল চোখে পড়ার মতো; পরিবারের প্রতি ছিল অসম্ভব শ্রদ্ধাশীল। আমরা তাকে অনেক শাসনে বড় করেছি, কিন্তু এখন মনে হয় তার মতো ছেলের জন্য হয়তো, এত শাসনের প্রয়োজন ছিল না। বাবা সংসারের খোঁজ-খবর না রাখায়, আমাদের মা অনেক কষ্ট করে আমাদের মানুষ করেছেন, পড়ালেখা করিয়েছেন। আহনাফও বড় হয়েছে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে।
প্রযুক্তি ও শিক্ষার প্রতি তার ঝোঁক
ক্লাস সিক্স থেকেই সে মোবাইলের খুঁটিনাটি শিখে ফেলেছিল। আশেপাশের সবাই তাদের যেকোনো সমস্যার সমাধানে তাকে ডাকতো। ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। মোবাইল বা ল্যাপটপের সমস্যা থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিভিন্ন জটিল বিষয়েও অনেকে তাকে বিনামূল্যে সমাধান জানার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা কল করত। সে বিরক্তি না দেখিয়ে, ধৈর্য ধরে সবার সমস্যার সমাধান করত।
অনেক কষ্টের পর সে মুন্সিগঞ্জ পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে। এরপর সে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে নিজের রোজগার ভালো হলে মানারাত ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। পরে ফুলটাইম চাকরি ছেড়ে সে “ইন্ড্রাসট্রিয়াল সার্কিট সল্যুশন” নামে নিজের সার্ভিসিং সেন্টার চালু করে এবং খিলক্ষেতে “সিটি পাওয়ার লিফট” নামে একটি প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম কাজ করত।
সংগ্রামী জীবন ও স্বপ্ন
নিজের রোজগার দিয়েই সে নিজে চলত, পড়াশোনা করত, বাসা ভাড়া দিত, মাকে সাহায্য করত, বাবাকে টাকা পাঠাত এবং নিজের ব্যবসা চালাত। এত কষ্ট সত্ত্বেও সে সব সামলে নিচ্ছিল। তার স্বপ্ন ছিল বিএসসি শেষ করে দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে দেশের শিল্প কারখানায় বড় ভূমিকা রাখবে।
সে ছিল অত্যন্ত সৎ, ধর্মভীরু ও আমলদার। নিয়মিত নামাজ আদায় করত এবং ঋণের ব্যাপারে ছিল ভীষণ কঠোর। সামান্য পেঁয়াজ বা মরিচও অন্যের বাড়ি থেকে কর্য করা পছন্দ করত না। প্রয়োজনে পেঁয়াজ-মরিচ ছাড়া রান্না করতে বলত। তার জীবনে একটিও রোজা ভাঙ্গা গেছে কিনা সন্দেহ আছে। মরিচ ডলে ভাত খেয়েও সে রোজা রাখত, কোনোভাবেই রোজা ভাঙত না। ছোটবেলা থেকেই সে পুরো মাস রোজা পালন করত।
একাডেমিক শিক্ষার বাইরেও নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য সে অনেক প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেছিল। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য ড্রাইভিং শিখে লাইসেন্স নিয়েছিল। নিজের আত্মরক্ষার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারাতে শিখে সার্টিফিকেট নিয়েছিল। তার ফ্রি সময় নষ্ট হতো না; সারাক্ষণ অনলাইনে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করত এবং সমসাময়িক সকল বিষয়ে ধারণা রাখত।
ছোট্ট থেকেই তার মেধা ছিল প্রখর
প্রাইমারিতে থাকতেই সে ইলেক্ট্রিক জিনিস নিজে নিজেই মেরামত করে সফল হতো। এই ঝোঁক থেকেই সে পলিটেকনিকে ভর্তি হয়েছিল এবং এই বিষয়ের উপরেই তার ক্যারিয়ার গড়ছিল।
আন্দোলনের শেষ মুহূর্ত
আহনাফের রাজনীতির প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু দেশের ও সমাজের কোনো অন্যায়কে সে সমর্থন করত না। সে এবং আমাদের পুরো পরিবার এই স্বৈরশাসকের ঘোর বিরোধী ছিলাম। আন্দোলন ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার পর আমি স্বার্থপরের মতো ওকে সাবধান থাকতে বলতাম, যেতে নিষেধ করতাম। কিন্তু ও রেগে যেত।
৪ আগস্ট সারাদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনে থাকার পর রাতে আমাদের অনেক্ষণ কথা হয়েছিল। আমার নিষেধ করায় সে রাগ করে কল কেটে দেয়। ৫ আগস্ট সকালে বারবার কল করলেও সে ধরেনি। দুপুরের দিকে যখন সে রিসিভ করল, তখন সে বাইপাইলে আন্দোলনে, ভিড়ের মধ্যে দৌড়ে দৌড়ে কথা বলছে। সে জানায়, “গুলাগুলি চলতেছে”। আমি সরে যেতে বললে— সে বলে, “ভাগ্যে যা আছে তাই হবে”।
এরপর বিকেল ৩:৪৩ মিনিটে আঙ্গুলে গুলি লাগার ছবি পোস্ট করে। বারবার কল দেওয়ার পর বিকেল ৪:১৩ মিনিটে সে কল রিসিভ করে। মাত্র ৮ সেকেন্ড কথা হয়। সে শুধু বলেছিল, “এত বার বার কল দেস কেন, আমি ঠিক আছি, এত কল দিসনা।” এটাই ছিল আমার সাথে তার শেষ কথা।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী দুঃসংবাদটি পাই। মনে হয়েছিল, যেন কেয়ামত হয়ে গেল। শুধু আল্লাহ জানেন, আমরা কিভাবে বেঁচে আছি। আহনাফ, তুমি আমাদের হৃদয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চিরকাল থাকবে। আমরা তোমাকে ভুলবো না।
লিখেছেন শহীদ আহনাফ আবির এর বোন সুমি