পর্তুগালকে রুখে দিয়ে কঙ্গোর ঐতিহাসিক সূর্যোদয়
বিশ্বকাপের মঞ্চ যে রোমাঞ্চ আর অঘটনের আঁতুড়ঘর, তা আরও একবার প্রমাণ করল আফ্রিকান পরাশক্তি ডিআর কঙ্গো। দীর্ঘ ৫২ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফিরেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শক্তিশালী পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দিয়েছে তারা।
বুধবার (১৭ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘কে’ গ্রুপের এই ম্যাচটি কঙ্গো ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ, পর্তুগিজদের আটকে দেওয়ার পাশাপাশি এই ম্যাচেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম গোল এবং প্রথম পয়েন্ট অর্জনের মহাকাব্যিক ইতিহাস রচনা করল আফ্রিকার দেশটি।
ম্যাচের শুরু থেকেই চেনা ছন্দে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। কঙ্গোর রক্ষণভাগকে কোণঠাসা করে ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই লিড নেয় পর্তুগিজরা। বামপ্রান্ত থেকে পেদ্রো নেতোর বাড়ানো নিখুঁত ক্রসে লাফিয়ে উঠে চমৎকার হেডে বল জালে জড়ান তরুণ মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেস।
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন নুনো মেন্ডিস। দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে বক্সে ঢুকলেও তাঁর জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি-নাজাউ। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় পর্তুগাল বল দখলে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও কঙ্গোর ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স ভাঙতে পারছিল না। সুযোগ সন্ধানী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও প্রথমার্ধে ছিলেন পুরোপুরি বোতলবন্দী।
যখন মনে হচ্ছিল পর্তুগাল ১-০ ব্যবধানের লিড নিয়েই বিরতিতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই নাটকের শুরু। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে কর্নার থেকে পাওয়া বল ধরে বামপ্রান্ত থেকে বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান আর্থার মাসুয়াকু। পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের স্তব্ধ করে দিয়ে দর্শনীয় হেডে বল জালে পাঠান ইয়োয়ান উইসা। উল্লাসে ফেটে পড়ে কঙ্গো শিবির, কারণ এই গোলের মাধ্যমেই বিশ্বকাপে নিজেদের খাতা খুলল তারা।
বিরতির পর ম্যাচে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করে পর্তুগাল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগিজ ফুটবলারদের পায়ে যেন রাজ্যের ক্লান্তি ভর করে, যার ফলে আক্রমণের ধার কমে যায়।
অন্যদিকে, সমতায় ফিরে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান কঙ্গো কাউন্টার অ্যাটাক ও নিটোল ডিফেন্সের রসায়নে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। পুরো ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে থাকা রোনালদো এদিন জাদুকরী কিছুই করতে পারেননি।
ম্যাচের ৬৮তম মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে ফ্রান্সিসকো কনসেসাওয়ের বাড়ানো দুর্দান্ত মাইনাস কঙ্গোর বক্সে পেয়ে যান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। প্রথম ছোঁয়াতেই আলতো প্লেসিং শটে গোল করতে চেয়েছিলেন সিআরসেভেন, কিন্তু বল গোলপোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে গেলে হতাশ হতে হয় পর্তুগালকে।
এরপর ৭৪তম মিনিটে ওয়ান-টু-ওয়ান পাস খেলে পর্তুগালের হয়ে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন প্রথম গোলের নায়ক জোয়াও নেভেস। কিন্তু গোলের শট নিতে অতিরিক্ত সময় নেওয়ায় কঙ্গোর ডিফেন্ডাররা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে বল ক্লিয়ার করে দেন।
ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট গোলবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে পর্তুগালের জয়ের আশা শেষ হয়ে যায়। উল্টো যোগ করা সময়ে কঙ্গোর গতিময় কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে গিয়ে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখতে হয় পর্তুগিজ ডিফেন্ডারদের।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হিউস্টন স্টেডিয়ামে যেন আফ্রিকার উৎসব নেমে আসে। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে এসে প্রথম ম্যাচেই একটি গোল ও একটি মূল্যবান পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের সমীকরণ জমিয়ে দিল কঙ্গো।
অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট হারিয়ে গ্রুপ পর্বে নকআউটের টিকিট কাটার লড়াইয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেল রবার্তো মার্তিনেসের পর্তুগাল। পরবর্তী ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে হলে রোনালদো-ব্রুনোদের এই ক্লান্তিময় ফুটবল ঝেড়ে ফেলে স্বরূপে ফিরতে হবে।
