পলাশীর শিক্ষা ভুললে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা: জাবি উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)-এর উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন জাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। প্রধান আলোচক ছিলেন- দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন- তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, অধ্যাপক ড. খোন্দকার লুৎফুল এলাহী এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. সালাহউদ্দিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, পলাশীর যুদ্ধের ইতিহাস আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয়, তা হলো পরনির্ভরশীলতার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকা। তিনি বলেন, মীর জাফর, জগতশেঠ ও রায়দুর্লভের মতো তৎকালীন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থে বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। এর ফলে দেশের কোনো কল্যাণ হয়নি; বরং দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ শোষণের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন, ইতিহাসের সেই শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দেশ বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার ও সম্পদ লুণ্ঠনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, যা জাতীয় স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অবস্থান অতীতের মতো বর্তমানেও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখন আর সরাসরি সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশ দখল করা হয় না; বরং বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক ঋণ ও তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ (Neo-colonialism) এবং পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে বিদেশি শক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ খোঁজে। এ ধরনের কৌশল সম্পর্কে জাতিকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে যে বিভক্তি ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই অনৈক্যের মাধ্যমে আমরা কি আবারও নতুন কোনো জগতশেঠ বা রায়দুর্লভের উত্থানের সুযোগ তৈরি করছি না?
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিন্নতা থাকতেই পারে, তবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থানের যে পরিবেশ গড়ে উঠেছে, জাতীয় পর্যায়েও সেই সংস্কৃতি চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের প্রধানের সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে উপাচার্য আশা প্রকাশ করেন, সরকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখবে।
বক্তব্যের শেষাংশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছে। তাদের সেই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন এবং অর্জিত স্বাধীনতাকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
