জাতীয় ঐক্যই স্বাধীনতা রক্ষার প্রধান শক্তি: মাহমুদুর রহমান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু)-এর উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।
জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। প্রধান আলোচক ছিলেন- দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, অধ্যাপক ড. খোন্দকার লুৎফুল এলাহী এবং সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. সালাহউদ্দিন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি সাজানো ক্ষমতার পালাবদল, যেখানে মীর জাফর, জগতশেঠসহ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলার স্বাধীনতা বিনষ্টে ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, সেই বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিক ফল ছিল ব্রিটিশ শাসনের লুণ্ঠন এবং ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো মানবিক বিপর্যয়।
তিনি অভিযোগ করেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ঘিরে ইতিহাসে নানা বিকৃতি রয়েছে। এসব বিকৃতির সত্যতা উদ্ঘাটনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বিশেষ পিএইচডি গবেষণা প্রকল্প চালুর আহ্বান জানান তিনি।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৭৫৭ সালের পর স্বাধীন রাষ্ট্র ফিরে পেতে এ অঞ্চলের মুসলমানদের ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। তবে এই অর্জনের পর আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি শক্তি যেন আর কখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
এদিকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, পলাশীর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো পরনির্ভরশীলতা বর্জন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি বলেন, মীর জাফর, জগতশেঠ ও রায়দুর্লভদের মতো সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বার্থে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আপস করেছিল, যার পরিণতিতে দেশ দীর্ঘদিন শোষণের শিকার হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে সরাসরি সামরিক দখলের পরিবর্তে ঋণ, উন্নয়ন সহযোগিতা, বহুজাতিক কোম্পানি এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার মাধ্যমে ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ (Neo-colonialism) বিস্তার লাভ করছে। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের বিকল্প নেই।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বিভাজনকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানের শেষে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা রক্ষায় সততা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
