বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ, জীবন ও বীরত্ব
নিয়মিত ছুটিতে গ্রামের বাড়ি ছিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। কিন্তু ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের খবর শুনে আর গ্রামে থাকতে পারেননি তিনি। ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসেন কর্মস্থলে। সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ সকাল সাড়ে ৯টা। প্যাট্রল অধিনায়ক হিসেবে শত্রুর উপর নজরদারি করছিলেন নূর মোহাম্মদ। আচমকা তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
মুহূর্মুহূ গুলি চালিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হয় পাকিস্তানী সেনারা। এসময় গুলিবিদ্ধ হন তার সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া। তবে ছেড়ে কথা বলেননি নূর মোহাম্মদ। আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে যান তিনি। কিন্তু এরই মাঝে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পড়েন নূর মোহাম্মদ। বাকিদের নিরাপদে পাঠিয়ে ওই অবস্থাতেই প্রতিরোধ করেন তিনি। তার কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন নূর মোহাম্মদ।
আজ ৫ সেপ্টম্বর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৪তম শাহাদাত বার্ষিকী। নিজের স্বাধীনতা অর্জনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম চিরকাল আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের পরিচিতি
ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি যশোর জেলার নড়াইল থানাধীন মহেশখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই পিতামাতাকে হারানোর পরও তিনি স্বপ্ন ও দায়িত্বের প্রতি অটল থাকেন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর আগ্রহ ছিল। ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি ইপিআরে যোগদান করেন। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে ৩ ডিসেম্বর নূর মোহাম্মদ দিনাজপুর সেক্টরের কুঠিবাড়ি ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ এবং সততার কারণে তিনি সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে নূর মোহাম্মদ শেখ সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন এবং দায়িত্বপালনে উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে নূর মোহাম্মদ গ্রামের বাড়িতে ছুটিতে ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতার খবর পেয়ে তিনি ছুটি শেষ করার আগেই কর্মস্থলে ফিরে আসেন। ৪ নং ইপিআর উইংয়ে যোগদান করেন। এরপর ৮ নং সেক্টরের অধীনে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে দলভুক্ত হন। আগস্ট মাসে তিনি যশোর জেলার চৌগাছা থানার ছুটিপুর গ্রামে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেন। যেখানে পাকিস্তানি সেনারা বারবার আক্রমণ চালিয়ে এলাকার দখল নিতে চেয়েছিল।
নূর মোহাম্মদ শেখের শাহাদাতের ঘটনা
৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সকাল প্রায় ৯:৩০ মিনিটে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ চারজন সহযোদ্ধার সঙ্গে ছুটিপুর প্রতিরক্ষা এলাকায় প্যাট্রল ডিউটিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন প্যাট্রল অধিনায়ক। শত্রুর উপর নজর রাখার দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। হঠাৎই পাকিস্তানি সৈন্যরা তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহন হন সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া।
সেই মুহূর্তেও অসাধারণ নেতৃত্ব দেন নূ মোহম্মদ। প্রতিরোধ চালিয়ে যান আহন নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়েই। পাকিস্তানি বাহিনী যেনো তাদের অবস্থান জানতে না পারে, সেজন্য বারবার পরিবর্তন গুলি চালাচ্ছিলেন তারা। কিন্ত হঠাৎই তাঁর ডান কাঁধে গুলি লাগে এবং ডান হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়। তবুও তিনি সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরাতে নিজের অবস্থান বারবার পরিবর্তন করে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুকে বিভ্রান্ত করেন।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপর সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফা’কে নির্দেশ দেন আহত নান্নু মিয়াসহ সবাইকে নিরাপদ স্থানে ফিরে যেতে। এরই মধ্যে শত্রুপক্ষ তাঁদের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন তাঁদের সামনে দুটো পথই খোলা ছিল, হয়- পিছু হটা এবং অন্যটি সরাসরি শত্রুর মোকাবিলা করা।
মারাত্মক আহত নূর মোহম্মদ ততক্ষণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়েন। সিপাহি মোস্তফা সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্যাম্পে ফিরে যেতে চাইলেও নূর মোহম্মদ বলেন- ‘আহত নান্নু মিয়া ও এলএমজিটিসহ তোমরা নিরাপদ স্থানে ফিরে যাও নতুবা আমরা সবাই মারা যাব। সেই সঙ্গে আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানটিও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।’
বাকিরা নিরাপদে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এলোপাথারিভাবে গুলি চালাতে থাকেন শত্রু পক্ষের দিকে। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন তিনি।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠিত দল সমন্বিতভাবে তীব্র আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে। ঘটনাস্থল থেকে নূর মোহাম্মদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে যশোর জেলার মুক্তাঞ্চল নামে পরিচিত শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।
ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে। তাঁর জীবন, দেশপ্রেম এবং সহযোদ্ধার প্রতি নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধ চিরকাল সকলের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে।
ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের নাম তাই বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার প্রতি অটল বিশ্বাসের প্রতীক। প্রতিটি প্রজন্মের জন্য তিনি রইলেন অম্লান প্রেরণার উৎস, যাঁর কৃতিত্ব ও সাহসিকতা চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর থাকবে।
সেনা বাহিনীর শ্রদ্ধা
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদের ৫৪তম শাহাদাত বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নূর মোহাম্মদের বীরত্বগাথা তুলে ধরা হয়।