স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংহত করতে হলে দরকার জাতীয় ঐক্য : ড. আবদুর রব
“এখন তরুণ প্রজন্ম জেগে উঠেছে, কিন্তু এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংহত করতে হলে দরকার জাতীয় ঐক্য। সত্য বললেই, দেশপ্রেমের কথা বললেই রাজাকার ও জামায়াত-শিবির বলে ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সত্য বললেই যদি দেশদ্রোহী বলা হয়, তাহলে জাতিকে অর্ধ শতাব্দী ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হবে”– বলে মন্তব্য করেছেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য, পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব: স্মরণে শহীদ আবরার ফাহাদ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
শহীদ আবরার ফাহাদ প্রসঙ্গে প্রফেসর রব বলেন, “আবরার একজন মুক্তির দিশারী, প্রতিরোধের বাতিঘর। আজ তার স্মরণসভা থেকে আমি জাতিকে আহ্বান জানাই—ঐক্যবদ্ধ হোন। যারা এই ঐক্যকে বিনষ্ট করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করুন এবং সচেতন হোন।”
আরও পড়ুন- শিক্ষিত নামধারীরাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত : প্রফেসর আবদুর রব
প্রফেসর আব্দুর রব বলেন, “আমি ৪১ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি—যেখানে ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’। নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল অবিচল—সেখানে একসময় ‘আল্লাহু আকবার’ বললেই লাশ পড়ত। অথচ এই স্লোগান কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; এটি কুরআনের ধ্বনি, মুসলমানের ধ্বনি।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায় তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই সেই জায়গা যেখানে আমি নিরবে চোখের পানি ফেলেছি। আমি যখন ছাত্র, তখন আমার রাজনৈতিক দর্শন ও পরিচয়ের কারণে আমার রুম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমার থিসিস পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, রুম থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও বিসিএস একাডেমিতে ক্লাস নিতে গেলে বিশেষ ট্যাগ দিয়ে আমাকে ক্লাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।”
আরও পড়ুন- শহীদ শাকিল পারভেজ
তিনি বলেন, “আমি ও আমার মতো অনেকেই নিপীড়িত-নিগৃহীত হয়েছি, কিন্তু বলার মতো কিছু ছিল না। আজ সেই ক্যাম্পাসে এসে বুক উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি—এ জন্য আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”
বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রফেসর রব বলেন, “আমার অপরাধ—আমি ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, এশিয়ান হাইওয়ে, সাব-রিজিওনাল গ্রুপিং, মেরিটাইম জুরিসডিকশন ও তালপট্টি নিয়ে কথা বলেছি। বলা হয়েছিল, আমরা সমুদ্র বিজয় অর্জন করেছি; অথচ তা ছিল নিছক পরাজয়। আমাদের টেরিটোরিয়াল সি ও এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন সংকুচিত করা হয়েছে। সরকার নিজেরাই তা তুলে দিয়েছে। মিডিয়া গোয়েবলসীয় কায়দায় সেই মিথ্যা প্রচার করেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের চারদিকে কাঁটাতার, রাস্তা ও ওয়াচ টাওয়ার বানিয়ে দেশটাকে ১৮ কোটি মানুষের এক জেলখানায় পরিণত করা হয়েছে। দক্ষিণে সমুদ্রেও তাদের আধিপত্য বিস্তার। নিজেদের সরকার হয়েও তারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে পারে!”
আরও পড়ুন- অপূর্ণতার প্রাপ্তি : আজমাইন ইসলাম
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় এমন জায়গা যেখানে শুধু পড়াশোনা নয়, সত্য অনুসন্ধান ও গবেষণা হয়। অথচ সত্য বলার কারণে অনেক শিক্ষককে পদাবনতি, অপসারণ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। পড়াশোনায় পিছিয়ে, কিন্তু গুণ্ডামিতে অগ্রসরদের রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক বানানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও বিসিএস একাডেমিতে ক্লাস নেওয়ার জন্য ডাকা হতো। পরে বলা হতো—‘বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শে দীক্ষিত’, তাই রাখা যাবে না। বন্ধুরা বলতো, ‘স্যার, আপনাকে বিশেষ ট্যাগ লাগানো হয়েছে, আপনাকে ডাকলে আমাদের চাকরি যাবে।’ অথচ এটি একটি স্বাধীন দেশ!”
সেমিনারের প্রধান অতিথি ড. মাহমুদুর রহমানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়, তা আমাদের দেখিয়েছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার রক্তাক্ত ছবি আজও আমাদের মধ্যে দ্রোহের সঞ্চার করে।”
ডাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন শহীদ আবরারের পিতা মো. বরকত উল্লাহ, রেজাউল করিম রনি ও আবরারের ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে তার ওপর রাতভর নির্যাতন করে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আসামী পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করলেও চলতি বছরের মে মাসে এই রায় পুনর্বহাল করে রায় দেয় হাইকোর্ট।