‘আমার সুমনরে আইনা দিবেন নি বাবা’
“বাবা, আমার সুমনরে দেখছেন? আমার সুমনরে দেখছেন? আমার সুমনরে আইনা দিবেন নি বাবা? আমার সুমনরে আইনা দিবেন নি বাবা? প্লিজ… আমার সুমনরে আইনা দিবেন নি বাবা? যদি আইনা দিতে পারেন, আমার শান্তি লাগবে।”—সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক নির্মিত আয়নাঘর ফাইলস- ৩ এ প্রকাশিত ভিডিওতে আয়নাঘর থেকে ফেরত ব্যারিস্টার আরমানের হাতধরে এভাবেই ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি করছিলেন গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ৩৮ (বর্তমান ২৫) নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকধারী ব্যক্তিরা ধরে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার পরিবার। সেদিন সুমনের সঙ্গে আরও সাতজন বিএনপি ও যুবদল কর্মী নিখোঁজ হন। এরপর এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেননি তারা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোপন কারাগার বা আয়নাঘর থেকে বেশ কয়েকজন বন্দি মুক্তি পান। কিন্তু ফিরে আসেননি বিএনপি নেতা সাজেদুল হক সুমন ও তার সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিরা।
আরও পড়ুন- ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আহনাফ : এক নক্ষত্রের পতন
প্রকাশিত ওই ভিডিওতে বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে তার বোন সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, “২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের ৪ নম্বার রোডের ৪০৪ নম্বার প্লটে বসেছিলেন সুমন ও কয়েকজন বন্ধু। আনুমানিক রাত ৮টার দিকে র্যাব-১ এর একটা ডাবল কাভার ভ্যান অনেক দ্রুত গতিতে এখানে এসে জোরে ব্রেক করে। এরপর সেখানে তারা যে আগুন পোহাচ্ছিল, ওই আগুনের মধ্যে দিয়ে রড গরম করে, সেটি দিয়ে সুমন ভাইকে অনেক মারে। এরপর জমটুপি পড়ায়, হাতকড়া পড়ায়ে খুব দ্রুত ঐখান থেকে তুলে নিয়ে যায়।”
সেসময় র্যাবের অসহযোগীতার কথা জানিয়ে সুমনের আরেক বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী বলেন, “আমরা সবাই র্যাব অফিসের সামনে গেলাম যোগাযোগ করতে। আমরা তো মনে করছি, তুলে নিয়ে আসছে, আইন অনুযায়ী যা হয় তাই হবে। আমরা সারারাত ওখানে দাঁড়ায় রইছি, ওই র্যাব অফিসের সামনেই দাঁড়ায় রইছি, কোনো গাড়ি আসে কিনা, ওদের নিয়ে যায় কিনা, এরকম দেখার জন্য।”
র্যাবের অস্বীকারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ওরা তো অস্বীকার করেই যাচ্ছে। র্যাব অফিসার জিয়াউল হাসান সাহেব বলছে– যে, “এরকম অনেক র্যাবের পোশাক কিনতে পাওয়া যায়, এরকম বহু মানুষ কিডন্যাপ করছে, এরকম আছে। এইটা র্যাব কিছু করে নাই, আমাদের প্রশাসন থেকে কিছু হয় নাই, এইটা কেউ কিডন্যাপ-টিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে।”
আরও পড়ুন- ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় ববির ৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার
ভাই হারানোর কষ্ট প্রকাশ করে সুমনের বোন তুলি বলেন, “নদী… আমাদের কাছে নদী যেন একটা বিশাল বড় গোরস্থান। মানুষ নদীতে ঘুরতে যায়। আমরা নদীতে যাইতে পারি না। আমরা নদীর দিকে তাকাইতে পারি না। নদীর ঢেউ দেখলেই মনে হয়, এই নদীর কোথাও আমার ভাইকে কি ওরা ফেলে রেখে গেছে কিনা?”
ভাইকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খার কথা জানিয়ে সুমনের বোন মারুফা বলেন, “একসময় শুনতে পাই, আয়নাঘরে নির্যাতনের কারণে অনেকে নাকি মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতো। আর তাদেরকে নাকি যেখানে সেখানে ফেলে রেখে আসা হতো। আমার মা সবকটা সিকিউরিটি গার্ডকে বলে রাখছিল যে, ‘যদি দেখো কেউ মাটিতে শুয়ে আছে, পাগল ভেবে তাড়িয়ে দিও না। আমাকে ডাক দিবা আমি এসে দেখবো।’ যখনই তিনি রাস্তার পাশে কোনো পাগলকে শুয়ে থাকতে দেখতেন, তিনি কম্বল তুলে দেখতেন—হয়তো এটা সুমন।”
সুমনকে ফেরত দিতে এক সময় তাদের কাছে এক কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন মারুফা ইসলাম। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের এক নেতা আমাদের প্রস্তাব দেয়, এক কোটি টাকা দিলে সুমনকে ছেড়ে দেবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে এক কোটি টাকাই দিবো। তারা বলল, ৫০ লাখ অ্যাডভান্স দেন, বাকিটা সুমনকে পেয়ে তারপর দিয়েন। কিন্তু আমরা বলি, একহাতে এক কোটি টাকা আর আরেক হাতে সুমন হলে আমরা রাজি। তাকে যখন এটা বললাম, সে আর রাজি হলো না।”
সুমনের মেয়ে হাফসা ইসলাম রাইতা বলেন, “যখন আমি শান্ত নীরব পরিবেশে থাকি, কোনো শব্দ থাকে না, তখন মনে হয় আমার বাবা যেন পেছন থেকে আমাকে ডাকছেন। এখনো আমি আমার বাবার নাম্বারে ফোন করি, শুধু দেখি রিং হয় কিনা। আমি শুনতে থাকি, “নাম্বারটি বন্ধ আছে।”
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরে আয়নাঘরে বন্দি থাকা অনেক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাদের মতো ভাইকে পেতে বিভিন্ন গোপন করাগারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন বলে জানা সুমনের বোন তুলি।
তিনি বলেন, “ঐদিন থেকে আমি প্রত্যেকটা গোপন কারাগারের বাইরে দাঁড়াতে শুরু করলাম। ফোন কল আসতেই থাকতো। সুমন এখন যেকোনো সময় ছাড়া পেয়ে যাবে। আমরা এই আশায় বেঁচে ছিলাম। কিন্তু সে বের হয়নি। তিন-চার-পাঁচ জন বের হওয়ার পর, আমরা গোপন কারাগার থেকে আর কাউকে বের হতে দেখলাম না।”