শিক্ষক সংকটে পাবিপ্রবি : ২৮ শতাংশ শিক্ষকই বিদেশে
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) পাঁচটি অনুষদভুক্ত ২১টি বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ১৯৮ জন। এর মধ্যে আবার উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে আছেন ৪৯ জন শিক্ষক। সে হিসাবে শতকরা ২৭.৭৪ ভাগ শিক্ষকই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও এমফিল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৫০০০। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, সিএসই ডিপার্টমেন্টের ১১ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫ জন শিক্ষকই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে, ইইই ডিপার্টমেন্টের ১৬ জনের মধ্যে ৪ জন, ইইসিই ডিপার্টমেন্টের ১১ জন যার মধ্যে ৪ জন, আইসিই ডিপার্টমেন্টে ১২ জনের মধ্যে ৪ জন, গণিত বিভাগের ১৪ জনের মধ্যে ৫ জন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৪ জনের মধ্যে ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে।
এছাড়াও রসায়ন বিভাগের ১০ জনের মধ্যে ২ জন, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ১১ জনের মধ্যে ১ জন, বাংলা বিভাগের ৭ জনের মধ্যে ১ জন, ইংরেজি বিভাগের ১০ জনের ২ জন, লোক প্রশাসন বিভাগের ৮ জনের মধ্যে ২ জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন।
অন্যদিকে, কয়েকটি ডিপার্টমেন্টে ৫০ শতাংশ বা এর বেশি শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ৮ জনের মধ্যে ৪ জন, ইউআরপি ডিপার্টমেন্টের ৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩ জন, ফার্মেসি বিভাগের ৯ জনের মধ্যে ৫ জন, পরিসংখ্যান বিভাগের ৭ জনের মধ্যে ৪ জন শিক্ষকই শিক্ষা ছুটিতে রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, ২১টি বিভাগের মধ্যে শুধুমাত্র স্থাপত্য বিভাগ, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, অর্থনীতি বিভাগ, পরিসংখ্যান বিভাগ এবং ইতিহাস বিভাগেই কোনো শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে নেই।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকটে অনেক শিক্ষক একাধিক কোর্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। চাপ বেশি হওয়ায় স্বল্প ক্লাস নিয়েই শেষ করছেন কোর্সগুলো। ফলে কোর্স শেষ হয়ে গেলেও অজানাই থেকে যাচ্ছে অনেক বিষয়। এদিকে চার বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স শেষ হতে লেগে যায় পাঁচ বছর। এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স (বি.ফার্ম প্রফেশনাল) শেষ করতে সময় লাগছে ছয় থেকে সাত বছর।
লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: মোহাব্বাস শেখ মিজান বলেন, “পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটের ভারে নুইয়ে আছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক বা অধ্যাপক না থাকায় সেশনজট বেড়েছে, ক্লাস-ল্যাবের গতি থমকে দাঁড়িয়েছে, আর গবেষণার আলো ও প্রজ্ঞা ক্রমেই ম্লান হয়ে ধূসর হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের দেশে ও বাহিরে উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য মতে- শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো আন্তর্জাতিক বা কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। আর পাবিপ্রবির অনেক বিভাগই পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতিতে স্থবির। দেশে বিদ্যমান অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা মৌলিক গবেষণায় অনেক পিছিয়ে আছি, শুধুমাত্র পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক এবং যোগ্য বিশেষজ্ঞদের অভাবে।”
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট এখনো কাটেনি। সমসাময়িক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় আমরা গবেষণা ও র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে, যার অন্যতম প্রধান কারণ শিক্ষক স্বল্পতা। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয় এবং দাপ্তরিক কাজেও ভোগান্তি দেখা দেয়। কম সংখ্যক শিক্ষককে অতিরিক্ত কাজের চাপ বহন করতে হয়, ফলে গবেষণায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “যেখানে একটি বিভাগে ১৫ জনের বেশি শিক্ষক প্রয়োজন, সেখানে কিছু কিছু বিভাগে মাত্র ৪ জন দায়িত্ব পালন করছেন। তাই প্রশাসনের কাছে আবেদন, দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বল্প শিক্ষকবিশিষ্ট বিভাগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক, যা সবার জন্যই মঙ্গলজনক হবে।”
শিক্ষক সংকটের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আবদুল আওয়াল বলেন, “শিক্ষক সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে। শিক্ষক নিয়োগের জন্য যে বিজ্ঞপ্তিগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিভাগের বোর্ড হয়ে গেছে। যে বিভাগগুলোতে শিক্ষক সংকট বেশি সেগুলোর সমস্যা নিরসনের চেষ্টা চলছে।”