বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা
ইসলামী শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর শান্তিডঙ্গা-দুলালপুর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সীমান্তে এ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষা প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার কাজ শুরু করে ১৯৮৬ সাল থেকে।
আজ শনিবার (২২ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়টি ৪৬ বছর পেরিয়ে ৪৭ বছরে পদার্পণ করেছে। বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি অনুষদের অধিনে ৩৬ বিভাগ চালু আছে। ২০২৫ -২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন অনুষদের অধীনে আরও দু’টি বিভাগ চালু হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, এখানে ১৯ হাজার ৮৯৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন। বর্তমান পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একাডেমিক কার্যক্রম চালু রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে শিক্ষার্থীদের থাকে নানান ধরনের আবেগ-অনুভূতি, দাবি-দাওয়া ও অনুপ্রেরণার গল্প। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ইবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন ঢাকা মনিটর ২৪- এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো.আশরাফুল ইসলাম।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তামান্না তাসনিম তারিন বলেন, “স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, আমাদের স্বপ্ন, পরিশ্রম, সংগ্রাম আর বেড়ে ওঠার গল্প। প্রতিদিনের ক্লাস, লাইব্রেরির শান্ত দুপুর, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আর শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা—সব মিলিয়ে ইবি আমার জীবনের খুব মূল্যবান একটি অধ্যায়। এটি শুধু উদযাপনের দিন নয়; আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি দিন। পাশাপাশি আমি আশা রাখবো— যেসকল বিষয়ে আমরা অন্যদের থেকে পিছিয়ে আছি, সেগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আগামী দিনে সাফল্য অর্জন করে এগিয়ে যেতে পারবো।”
আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম আরাফাতের ভাবনা ঠিক এমনটা, “আমরা সর্বদা স্বপ্ন দেখি এক সুন্দর আগামীর। সেই সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭৫ একরের সবুজ চত্বরে। এ বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের গভীর আবেগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বিত উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আমাদের এই প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটি নবযাত্রা শুরু।”
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা একজন শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন সংকট অত্যন্ত পীড়াদায়ক একটি বাস্তবতা। তাই, আমি জোরালো দাবি জানাই—প্রশাসন দ্রুত সকল প্রকার আবাসন সংকট কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করুক। ক্যান্টিনের খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষক সংকট নিরসন ও ক্লাসরুম সংকট দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে প্রশাসন। তবুও স্বপ্নের পথে ছুটে চলা এই স্বাপ্নিকের স্বপ্নগুলো পূর্ণতা লাভ করুক।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মুমতাহিনা রিনির মতে, “সময়ের পরিক্রমায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আজ ৪৭ বছরে পদার্পণ করছে। দীর্ঘ এই পথচলায় অর্জনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোর কিছু দুর্বলতা এখনও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভর্তি ও সার্টিফিকেট উত্তোলন এবং এ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি আধুনিকায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভর্তি এবং সনদ উত্তোলনে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, বিভিন্ন অফিসে ঘুরাঘুরি এবং ব্যাংকে বারবার যাওয়া— সব মিলিয়ে একটি সাধারণ প্রক্রিয়া অযথাই জটিল হয়ে ওঠে।”
মুমতাহিনা রিনির চাওয়া, “অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হলে এই সেবাগুলো হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-সেবার মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক আধুনিকায়নের স্বার্থেই এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতগুলোতে ই-সিস্টেম চালু করা আজ সময়ের অত্যাবশ্যকীয় দাবি বলে মনে করি। সর্বপরি একটি শিক্ষার্থী বান্ধব ও একাডেমিক স্বাধীনতা মূলক ক্যাম্পাস কামনা করি।”
ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু হানিফ নিজের ভাবনার সঙ্গে দাবিও রাখলেন একটি, “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আমাদের জন্য শুধু উদযাপনের দিন নয়—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ইবি দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমরা চাই এই অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হোক। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমেই আমাদের ভাই, শহীদ সাজিদ আব্দুল্লাহকে হত্যা করার যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে—তার দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা। সেশন জট নিরসনে কাজ করা। সনদ উত্তোলনের জটিল প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ ও নেতৃত্ব বিকাশে ইকসু নির্বাচন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়—আমরা এর দ্রুত আয়োজনের প্রত্যাশা করি।”
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদুল ইসলামের ভাবনা, “বিশ্ববিদ্যালয় এক স্বপ্নের নাম। এই স্বপ্নকে ছুঁতে কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না করতে হয় একজন শিক্ষার্থীকে! তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কি এই একই অনুভূতি বজায় থাকে? আমি এখন পর্যন্ত যত ইবি শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি তাদের অধিকাংশই প্রচন্ড রকমের হতাশা প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের যে স্বপ্ন থাকে এখানে ভর্তি হওয়ার পর সে- স্বপ্ন যেন আফসোসে পরিণত হয়। এর কারণ কি শুধুই এর অবস্থান? না, রাজনীতি, প্রশাসনিক, দুর্বলতা? ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অথচ তার অনেক বৈশিষ্ঠ্যই এখানে অনুপস্থিত। সন্ধ্যা নামলেই (জিয়া মোড় ব্যতিত) প্রায় বিশ হাজার শিক্ষার্থী’র এই বিশ্ববিদ্যালার হয়ে ওঠে জনশূন্য এক গহীন এলাকা। এখানে না হয় আড্ডা, না হয় ভালো পড়াশোনা। অথচ আমরা দেখি যেখানে আড্ডা হয় সেখানে ভালো লেখাপড়াও হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে হতাশা নয় বরং হয়ে উঠুক শিক্ষার্থীদের সত্যিকার স্বপ্নের নাম। ইবি শিক্ষার্থী হিসেবে এটাই আমাদের চাওয়া।”