নিভে গেল গণতন্ত্রের প্রদীপ্ত শিখা, এক নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ
বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ লড়াই আর কোটি মানুষের প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে শীতের এই ভোরে নিভে গেল গণতন্ত্রের এক প্রদীপ্ত শিখা। যে আপসহীন কণ্ঠস্বর কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের কথা বলেছে, আজ সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হলো।
আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
সকাল সোয়া ৯টায় হাসপাতালের সামনে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে দলীয় চেয়ারপারসনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি—গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে বেগম জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উপস্থিত ছিলেন পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান এবং প্রয়াত কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি। এছাড়া শোকাতুর স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ কিডনি, ফুসফুস ও চোখের বহুমুখী জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়লে বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি একঝাঁক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিনরাত তাঁর সেবা করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শারীরিক প্রতিকূলতায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী ১৯৬০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দলটির নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়া কোনো আসনেই কখনো পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন আসন থেকে এবং ২০০৮ সালে তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়ী হন তিনি।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক। স্বামী ও সন্তান হারানোর শোক, জেল-জুলুম, কারাবাস আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা—সবকিছুকে তুচ্ছ করে তিনি অটল ছিলেন নিজের রাজনৈতিক আদর্শে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মুসলিম বিশ্বেরও দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং পুরো দেশ এক অভিভাবককে হারাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম অমোচনীয় হয়ে থাকবে। রাজনীতির যে শূন্যতা আজ তৈরি হলো, তা অপূরণীয়।