আট বছরেও পাস হয়নি ডিপিপি : অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেকেও বাদ জাবিপ্রবি
প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ছিল বড়, প্রতিশ্রুতি ছিল আরও বড়। ৫৩০ একর জমির ওপর আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠার আট বছর পেরিয়ে গেলেও জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এখনো একনেকের অনুমোদনের পর্যায়েই পৌঁছাতে পারেনি। সরকার বদলেছে, উপাচার্য বদলেছে, বদলেছে শিক্ষার্থীদের প্রজন্মও কিন্তু বদলায়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাস্তব চিত্র।
২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। শেখ হাসিনার মায়ের নামে নামকরণ করা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি জামালপুরে প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সে সময় এটিকে দেশের অন্যতম আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে সরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারা কেন এর অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হলো?
বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম এখনো চলছে একটি পুরোনো ফিশারিজ কলেজকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার পর আট বছরেও গড়ে ওঠেনি উল্লেখযোগ্য কোনো একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার বা আধুনিক ল্যাব।
যেটুকু অবকাঠামো আছে, তার বেশিরভাগই কলেজ সময়কার। নতুন সংযোজন বলতে কয়েকটি টিনশেড ভবন। ছাত্র ও ছাত্রী হল দুটি। সেগুলোর নির্মাণও কলেজ থাকাকালীন। নাম বদলেছে, সাইনবোর্ড বদলেছে, কিন্তু কাঠামোগত বাস্তবতা বদলায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রায় ৩০ একর জমি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকলেও এর অনেক অংশের আইনগত ক্রয় ও অধিগ্রহণ এখনো সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ যে জমির ওপর স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ার কথা, তার মালিকানাই এখনো চূড়ান্ত নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুইজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও কেউই ডিপিপিকে একনেক অনুমোদনের পর্যায়ে নিতে পারেননি।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আসে। বিশ্ববিদ্যালয়েও আসে নতুন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। ধারণা করা হচ্ছিল, রাজনৈতিক চাপমুক্ত এই সময়ে অন্তত ঝুলে থাকা ডিপিপিটি একনেকে উঠবে। কিন্তু সরকারের শেষ একনেক সভায়ও এই প্রকল্প স্থান পায়নি। উল্টো বড় ধাক্কা এসেছে পরিকল্পনায়।
সূত্রের খবর, ৫৩০ একরের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে বর্তমান প্রশাসন। নতুন নির্দেশনায় মাত্র ৩০ একর জমির ওপর ভিত্তি করে নতুন নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ এই ৩০ একর জমিরও একটি বড় অংশের ক্রয় ও আইনি প্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে। এতে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ডিপিপি অনুমোদন ও স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রতিবারই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস এসেছে – “খুব শিগগিরই হবে।”
২৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেক সভা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ একনেক বলা না হলেও এটি নির্বাচন-পূর্ব অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ উন্নয়ন সভা বলেই ধরা হচ্ছে। এই সভা হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মোঃ রবিউল ইসলামের সাথে এ বিসয়ে কথা বললে তিনি জানান, প্রকল্পটি বর্তমানে একনেকে অনুমোদনের পর্যায়েই নেই।
বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একনেকে পাঠানোর জন্য একটি নোট দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সম্মতি দিলে এটি পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সেখানে মূল্যায়ন কমিটি গঠন, সরেজমিনে যাচাই, প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন এবং সংশোধনের এই প্রক্রিয়া বাকি। এসব ধাপ পেরোলেই কেবল একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা সম্ভব।”
আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, নতুন সরকার এই প্রকল্পকে কোন চোখে দেখবে? আট বছরে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় ডিপিপি অনুমোদনের প্রাথমিক বৈতরণীই পার হতে না পারে, তবে তার ভবিষ্যৎ আদৌ কোথায়?