স্মৃতির ক্যানভাসে শৈশবের ঈদ, পাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ঈদুল আযহা
মাঠের পর মাঠ সবুজ ঘাসের ওপর সোনালি রোদের ওড়াউড়ি, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর বাতাসে এক পবিত্র আনন্দের সুবাস—জানান দিচ্ছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আযহার আগমনী বার্তা। কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার এক অনন্য মেলবন্ধন। শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততা কিংবা বিদ্যাপীঠের ক্লাস-পরীক্ষার চিরচেনা চাপ পেরিয়ে সবাই এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা কীভাবে দেখছেন এই ত্যাগের উৎসবকে? তাদের আনন্দ, অনুভূতি, ছোটবেলার স্মৃতি আর উৎসব ঘিরে যাপিত জীবনের নানা সংকট ও ভাবনার কথা তুলে ধরেছে ঢাকা মনিটর ২৪- এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আহনাফ মুনতাসির।
ঈদুল আযহা আমাদের শেখায় বিনয় ও সংযমের পাঠ। ত্যাগের মাধ্যমে নিজের ভেতরের অহংকারকে দূর করে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে এই ঈদের আসল সার্থকতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ নাদির এই উৎসবকে দেখেন আত্মশুদ্ধি ও মানবতার এক মহিমান্বিত পবিত্র উপলক্ষ হিসেবে।
আহমেদ নাদির বলেন, আমাদের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে বছরে দুইটি বড় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহা আমার কাছে ত্যাগ,আত্মশুদ্ধি ও মানবতার এক মহিমান্বিত উৎসব।এই ঈদ আমাদের শেখায়, আত্মত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত মহত্ত্ব। কোরবানির মূল শিক্ষা শুধু পশু কোরবানি নয়, বরং নিজের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করে মানবতার পথে এগিয়ে যাওয়া।
আহমেদ নাদির আরও যোগ করেন, এই উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, সমাজের সব স্তরের মানুষ একে অপরের কাছাকাছি আসে। সামর্থ্যবান মানুষ অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়ায়, যা মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করা এবং সবার মুখে হাসি ফোটানোর আনন্দ সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
উৎসবের বাহ্যিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আহমেদ নাদির মনে করিয়ে দেন, তবে কখনো কখনো কোরবানির মূল শিক্ষা আড়ালে পড়ে যায় বাহ্যিক প্রদর্শন ও প্রতিযোগিতার ভিড়ে। অথচ এই ঈদের আসল তাৎপর্য হওয়া উচিত বিনয়, সংযম ও মানবকল্যাণের চর্চা। তবে আমার কাছে কোরবানির ঈদ মানে ত্যাগের মাধ্যমে হৃদয়কে আরও মানবিক করে তোলার এক পবিত্র উপলক্ষ।
উৎসবের এই আবহে আনন্দের পাশাপাশি জড়িয়ে থাকে কিছু বাস্তব দুঃখ-কষ্ট ও সমাজভাবনা। বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি আর যাতায়াতের ভোগান্তি সত্ত্বেও ক্যাম্পাস ছুটির পর পাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা গভীর আশা নিয়ে ঈদকে বরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুর রউফ মনে করেন, ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে যখন আমরা সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব।
আব্দুর রউফ তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, পবিত্র কোরবানি ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, ভালোবাসা ও সাম্যের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ আমাদের জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই এই ঈদের মূল শিক্ষা।
উৎসবের আমেজে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরে আব্দুর রউফ বলেন, তবে আনন্দের মাঝেও কিছু দুঃখ-কষ্ট রয়ে যায়। অনেক নিম্নআয়ের মানুষ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোরবানি দিতে পারেন না, আবার কেউ কেউ প্রিয়জনদের দূরে রেখে ঈদ উদযাপন করেন। বাজারদর বৃদ্ধি, যাতায়াতের ভোগান্তি ও দৈনন্দিন জীবনের চাপ অনেকের ঈদের আনন্দকে কিছুটা ম্লান করে দেয়। তবুও মানুষ আশা ও ভালোবাসা নিয়ে ঈদকে বরণ করে নেয়।
ঈদের প্রকৃত সার্থকতা নিয়ে আব্দুর রউফ বলেন, কোরবানি আমাদের শেখায় আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার মূল্যবোধ। এই ঈদে আমরা যদি নিজের আনন্দের পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাহলেই ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈদের আনন্দ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আব্দুর রউফ বলেন, আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাই—ঈদের আনন্দ যেন কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যেই কোরবানি ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত।
কোরবানির মূল দর্শন হলো নিজের ভেতরের পশুবৃত্তিকে কোরবানি দেওয়া। লোকদেখানো প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যহীন এক সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল, ইলেকট্রনিক এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আল-মুত্তাকীন শুভ।
আল-মুত্তাকীন শুভ বলেন, আমি ঈদ বলতে মূলত কোরবানির ঈদকেই বুঝি। ঈদের যে মাহাত্ম্য—সকলকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা,তা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় এই উৎসবের মধ্য দিয়ে। সম্ভবত বছরে এই একটি দিনই, যেদিন মুসলিম উম্মাহর সবাই অন্তত একবেলা ভালোভাবে খাওয়ার সুযোগ পায়। কোরবানির গোশত সবার মাঝে বিতরণের যে শিক্ষা, তা যদি সারা বছর অনুসরণ করা যেত, তবে হয়তো কেউ অনাহারে থাকত না।
তবে কোরবানির শিক্ষা না মানা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, কোরবানির ত্যাগের প্রকৃত মহিমা আমরা কয়জনই বা ধারণ করতে পারি? বনের পশুর সঙ্গে যদি মনের পশুকেও কোরবানি করতে পারতাম, তাহলে সমাজে এত ধর্ষণ, খুন ও অনাচার থাকত না। কোরবানিতে বহুমূল্যের পশু নিয়ে লোকদেখানো প্রতিযোগিতা ইবাদতের পবিত্রতা নষ্ট করে হারামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোরবানির ত্যাগের শিক্ষা ধনী-গরিব ভেদাভেদহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখুক।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে উৎসবের রঙ কিছুটা বদলালেও ছোটবেলার স্মৃতির পাতাগুলো সবসময় অমলিন থাকে। হাটে যাওয়ার আনন্দ, কোরবানির পশুর প্রতি মায়া আর ঈদের দিনের ব্যস্ততা নিয়ে নিজের আবেগের কথা জানিয়েছেন পাবিপ্রবি-র ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া রাশমিন স্নেহা।
সুমাইয়া রাশমিন স্নেহা তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, কুরবানির ঈদ মানেই অন্যরকম ব্যস্ততা, আনন্দ আর স্মৃতির কোলাহল। যদিও এখন বড় হয়ে সেই ছোটবেলার ঈদের ফিলিংসটা আর পাওয়া যায়না । তবে ছোট থেকেই মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমার কাছে আসল আকর্ষণের ব্যাপার ছিল আব্বুর সঙ্গে গরুর হাটে যাওয়া।
হাটে না যেতে পারলে থাকত অধীর অপেক্ষার প্রহর। তিনি বলেন, যদি কোনো কারণে হাটে না যাওয়া হতো তাহলে আব্বু হাট থেকে গরু বা খাসি নিয়ে কখন আসবেন, সেই অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে থাকতাম। সেই সময়ে বাসায় গরু আসার পর তাকে খাওয়ানো, গলায় মালা পরানো আর তাকে নিয়ে পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই ছিল আলাদা। বন্ধুদের গরু-খাসি দেখতে যাওয়ার সেই দিনগুলো ঈদের দিনের চেয়েও বেশি স্পেশাল লাগতো।
ঈদের দিনের ও পরবর্তী ব্যস্ততার বর্ণনা দিয়ে সুমাইয়া রাশমিন স্নেহা বলেন, তবে ঈদের সকালে মনটা ভারী হয়ে উঠত। দুইদিন এর কাটানো সময়ের কারণে এত মায়া তৈরি হতো। এই মায়ার কারণে কোরবানির দৃশ্য কখনোই দেখতে পারতাম না, খারাপ লাগত। এরপর শুরু হতো আম্মুর সাথে মাংস কাটাকুটি, রান্না আর ভাগাভাগির ব্যস্ততা। প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের বাসায় মাংস বিলিয়েই দুপুর কেটে যেত। বিকেলে সুন্দর করে সেজে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হতাম। এইতো এইভাবেই সারাটা দিন কেটে যেত।
হারিয়ে যাওয়া আবেগ নিয়ে সুমাইয়া রাশমিন স্নেহা বলেন, এখন বড় হয়ে সেই ছোটবেলার চেনা আবেগ আর ঈদের ফিলিংসটা আর খুঁজে পাই না। স্মৃতির পাতায় জমা থাকা সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ে।
শত ব্যস্ততা এবং যানজটের ভোগান্তি পেরিয়েও পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তগুলো ক্যাম্পাস জীবনের চাপের মাঝেও শিক্ষার্থীদের মনে এনে দেয় নতুন শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম অনিক উৎসবের এই সার্বিক চিত্রটি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
শফিকুল ইসলাম অনিক বলেন, ঈদুল আযহা ঘিরে চারদিকে এখন আনন্দ আর উৎসবের উচ্ছ্বাস। কোরবানির হাটে মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য, পশু দেখার আগ্রহ, দরদাম আর বন্ধুদের সঙ্গে হাট ঘোরার মুহূর্তগুলো যেন আলাদা এক ভালো লাগা তৈরি করে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস ও পড়াশোনার চাপের মাঝেও পরিবারের সঙ্গে ঈদের প্রস্তুতিতে অংশ নেওয়া হৃদয়ে এনে দেয় প্রশান্তি ও নতুন উদ্যম। যদিও যানজট, ভিড় ও বাড়তি খরচ কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি করছে, তবুও ত্যাগ, ভালোবাসা ও ভাগাভাগির মহিমায় ঈদ হয়ে ওঠে সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য উৎসব।