আঠারোতে উদ্দীপ্ত পাবিপ্রবি : শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে মূল্যায়ন
ইছামতীর তীরে স্বপ্নের বীজ বুনেছিল যে পথচলা, আজ তা কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পদার্পণ করেছে। ২০০৮ সালের ৫ই জুন যাত্রা শুরু করা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) আজ ১৮ বছরে পা রাখছে। দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণার প্রসার এবং একাডেমিক উৎকর্ষের ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে। যদিও সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি ঘুচেনি, তবুও শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে এক নতুন আগামীর স্বপ্ন আর দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ দিনে বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাণের ক্যাম্পাসের অর্জন, সংকট এবং আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশংসার পাশাপাশি তারা গবেষণার পরিবেশ উন্নত করা, আধুনিক লাইব্রেরি সুবিধা, আবাসিক সমস্যার সমাধান এবং ক্যাম্পাসকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্মার্ট ক্যাম্পাস’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। ঢাকা মনিটর ২৪-এর ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আহনাফ মুনতাসিরের নেওয়া সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের সেই মূল্যায়ন।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আবেগ, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ। তাই শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ গঠনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-শুবিধা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দেড় যুগ পেরোলেও শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়ক পরিবেশ কতটা তৈরি করতে পেরেছে, সেটিই এখন প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন ভবন চালুর ফলে ক্লাসরুম ও ল্যাব সংকট কিছুটা কমলেও আধুনিক ল্যাব সরঞ্জামের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে, যা গবেষণার গতি অনেকটাই সীমিত করছে। ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদে আইইবি (IEB) স্বীকৃতির অভাব এবং শিক্ষক সংকট এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। ক্যাফেটেরিয়া ও হল ডাইনিংয়ের খাবারের মান, পাশাপাশি আবাসিক হলে ইন্টারনেট ও ফ্যানের অপ্রতুলতা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে আউটকাম বেইজড ইভালুয়েশন (OBE) বাস্তাবায়ন ও গবেষণা ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কনফারেন্সে অংশগ্রহণে ভাতা, গবেষণা প্রকল্পে বরাদ্দ, Q1 ও Q2 জার্নালে প্রকাশে প্রণোদনা এবং বিভিন্ন গবেষণা পুরস্কার শিক্ষার্থীদের ও শিক্ষক-গবেষকদের নতুনভাবে উৎসাহিত করছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে প্রত্যাশা থাকবে উল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধান করে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়ার দূরত্ব কমিয়ে কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ বাড়ানো।’
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী রাইসা আমিন বলেন, ‘আজ ৫ এ জুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। এই সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আমরা যখন ২০২২ সালে ভর্তি হই, তখন পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব ছিল। বর্তমানে নতুন দুটি একাডেমিক ভবন চালু হওয়ায় প্রায় প্রতিটি ব্যাচ নিজস্ব শ্রেণিকক্ষের সুবিধা পাচ্ছে। তবে এখনও উন্নয়নের বেশ কিছু ক্ষেত্র আছে। বহুবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের এখনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, নিজস্ব কক্ষ কিংবা নির্দিষ্ট বাজেট নেই, যা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বর্তমানে বিভিন্ন সেমিনার ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে, যা প্রশংসনীয়। তবে এসব কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্মজীবন সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।’
নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দেশের ও দেশের বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণও সময়ের দাবি। এছাড়া আবাসিক হলগুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।’
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ফিজ্জুল মাহিন বলেন, ‘আমাদের যা নেই তা অবশ্যই একদিন হবে। কিন্তু না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে চললে আমরা কখনোই এগিয়ে যেতে পারবোনা। ৩০ একরে আমাদের অনেক কিছুই আছে। এখন শুধু ভালোভাবে এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তার মাধ্যমে প্রতিটি জিনিসকে কাজে লাগাতে পারলেই একদিন আমরাও পারবো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নামকে উজ্জ্বল করতে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) বাংলাদেশের ২৯তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭ম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বর্তমানে পাঁচটি ফ্যাকাল্টিতে ২১টি ডিপার্টমেন্টে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে তার বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ২১১ জন। এর মধ্যেও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য শিক্ষকদের একটা বড় অংশ বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন। অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর রেশিও ১৮ বছরেও আমরা পূরণ করতে পারিনি।’
র্যাঙ্কিং ও অবকাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পাবিপ্রবি তার অবস্থান জানান দিলেও, বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর। শুরুতে অস্থায়ী ক্যাম্পাস থাকলেও বর্তমানে আমাদের নিজস্ব তিনটি একাডেমিক বিল্ডিং রয়েছে। এখন আমরা ক্লাসরুম সংকট থেকে অনেকটা মুক্ত। তবে হলের শিক্ষার্থীরা আবাসন সুবিধা পেলেও সেখানকার অন্যান্য সুবিধা যেমন সুষম খাবার, ইন্টারনেট সুবিধা, লাইব্রেরি সুবিধা অত্যন্ত নাজুক।’
লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী এনামুল হক ইমন বলেন, ‘আমাদের প্রিয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) শুধুমাত্র একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, আশা এবং ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম কেন্দ্র। তবে উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতার মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে স্থাপিত স্পিড ব্রেকারগুলোর মান ও নকশা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নামফলক ও পরিচিতিমূলক অবকাঠামো বর্তমান সময়ের মর্যাদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দিনের বেলায়ও অনেক বাইরের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সহজে শনাক্ত করতে পারে না, আর রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, দিকনির্দেশনা বোর্ড এবং দৃশ্যমান পরিচিতি চিহ্নের অভাব।’
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্পিড ব্রেকার, দূর থেকে দৃশ্যমান আলোকিত নামফলক, মহাসড়কের উভয় পাশে সাইনবোর্ড স্থাপন এবং মূল ফটককে আধুনিক ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে উন্নীত করা প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধুমাত্র একাডেমিক ভবন নির্মাণ নয়; বরং নিরাপত্তা, সৌন্দর্য এবং জনসাধারণের কাছে প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
তড়িৎ, ইলেকট্রনিকস ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো: নাজমুস সাকিব বলেন, ‘২০০৮ সালের ৫ জুন ইছামতীর স্নিগ্ধ তীরে গড়ে ওঠা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) আমাদের কাছে নিছক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক বুক আবেগ ও ভালোবাসার নাম। ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইসিই) বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার ঐকান্তিক প্রত্যাশা—আমাদের এই প্রাণের ক্যাম্পাস হয়ে উঠুক আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী।’
গ্রন্থাগারের সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃৎপিণ্ড হলো তার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বর্তমানে আমাদের লাইব্রেরিটি বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন। ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীর তুলনায় এখানে আসন ও বইয়ের তীব্র সংকট রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চার সুবিধার্থে ‘সিঙ্গেল স্টাডি টেবিল’, প্রতিটি টেবিলে ল্যাপটপ চার্জিং পোর্ট এবং পর্যাপ্ত ফ্যান, এসি ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।’
তিনি শেষ করেন এভাবে, ‘অত্যন্ত আশার কথা হলো, সম্প্রতি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন মাননীয় উপাচার্য মহোদয় যোগদান করেছেন এবং তিনি পাবিপ্রবিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্মার্ট ক্যাম্পাস’ হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে গভীর আশার সঞ্চার করেছে। আমরা মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের এই যুগোপযোগী ঘোষণার দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন চাই।’
