কেইনের জোড়া ও বেলিংহ্যাম ম্যাজিকে ইংল্যান্ডের দাপুটে শুরু
প্রথমার্ধে সমানে-সমান লড়াই, পেনাল্টির নাটকীয়তা আর চার গোলের থ্রিল— সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করলেন এক ক্ল্যাসিক দ্বৈরথ। তবে দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের সুনামি বইয়ে দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল থ্রি লায়ন্সরা।
গোলপোস্টের নিচে ক্রোয়াট গোলরক্ষক ডোমিনিক লিভাকোভিচ অতিমানবীয় দেয়াল হয়ে না দাঁড়ালে ক্রোয়েশিয়াকে হয়তো আজ লজ্জার হারের ইতিহাস লিখতে হতো। শেষ পর্যন্ত টমাস টুখেলের অধীনে আক্রমণাত্মক ফুটবলের দারুণ প্রদর্শনীতে আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ‘এল’ গ্রুপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে ৪-২ গোলের বড় জয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল ইংল্যান্ড।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে মেতে উঠেছিল। তবে ম্যাচের অষ্টম মিনিটেই বড় ভুল করে বসেন ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ তারকা লুকা মদ্রিচ। বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি ননি মাদুয়েকেকে আঘাত করলে রেফারি সরাসরি পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
পেনাল্টি শট নিতে আসেন থ্রি লায়ন্স অধিনায়ক হ্যারি কেইন। তাঁর নেওয়া প্রথম শটটি বামদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকে দেন ক্রোয়াট প্রাচীর ডোমিনিক লিভাকোভিচ।
ক্রোয়েশিয়া যখন সেই দুর্দান্ত সেভের উল্লাসে মত্ত, তখনই ভিএআর রেফারির শরনাপন্ন হন মুল রেফারি। পুনরায় পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ আসলে এবার আর কোনো ভুল করেননি কেইন। তিনি আবারও একই দিকে শট নিলেও লিভাকোভিচ ঝাঁপিয়ে পড়েন উল্টোদিকে। বল জালে জড়াতেই গ্যালারিতে থাকা ইংলিশ সমর্থকদের সাদা সমুদ্রে জোয়ার আসে।
ম্যাচের ২৯তম মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে আসা একটি দুর্দান্ত ক্রসে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন জুড বেলিংহ্যাম। তবে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে দুর্দান্তভাবে সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া।
মাঝমাঠে চমৎকার এক ট্যাকলে বল কেড়ে নিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢোকেন পিটার সুচিচ। তাঁর নিখুঁত ব্যাক পাস থেকে বক্সের বাইরে থাকা মার্টিন বাটুরিনা বুলেট গতির এক শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন। বলের নাগাল পেলেও গতির কারণে ইংলিশ গোলরক্ষক তা রুখতে পারেননি।
ক্রোয়াটদের এই সমতা ফেরানোর স্বস্তি অবশ্য বেশি সময় স্থায়ী হতে দেননি হ্যারি কেইন। ঠিক ৬ মিনিট পর, ম্যাচের ৪২তম মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে ক্রোয়েশিয়ার দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে নিখুঁত হেডে ইংল্যান্ডকে আবারও লিড এনে দেন ইংলিশ অধিনায়ক।
তবে প্রথমার্ধের নাটকের তখনও কিছুটা বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে বক্সের ভেতর লং বল থেকে ইভান পেরিশিচের চমৎকার হেড পাস পেয়ে যান পিটার মুসা। বল পেয়েই এক বুলেট গতির অনবদ্য ভলিতে ইংল্যান্ডের জাল কাঁপিয়ে দেন মুসা। ফলে ২-২ গোলের রোমাঞ্চকর সমতা নিয়ে বিরতিতে যায় দুই দল।
বিরতি থেকে ফিরেই ক্রোয়েশিয়ার ওপর আক্রমণের পসরা সাজিয়ে বসে ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটেই একক নৈপুণ্যে ক্রোয়াট ডিফেন্ডারকে গতিতে পরাস্ত করে ডানপ্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শটে দুর্দান্ত গোল করেন জুড বেলিংহ্যাম।
এর পরের মিনিটেই বেলিংহ্যামের আরেকটি বিপজ্জনক শট কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন লিভাকোভিচ। কর্নার থেকেও গোলের সুযোগ পেয়েছিল ইংল্যান্ড, তবে ফাঁকায় থাকা নিকো ও’রাইলি ঠিকঠাক মতো হেড করতে পারেননি।
ম্যাচের ৫২তম মিনিটে আরেকবার ক্রোয়েশিয়াকে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে রক্ষা করেন লিভাকোভিচ। ডেক্লান রাইসের নেওয়া টপ-কর্নারের কোণাকুণি শট ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন তিনি।
এর ঠিক তিন মিনিট পরই টানা দুটি সেভ দিয়ে ইংলিশদের স্তব্ধ করে দেন লিভাকোভিচ। প্রথম দফায় ও’রাইলির শট আটকে দিলেও বল গ্লাভসবন্দি করতে পারেননি তিনি। সেখান থেকে ফিরতি বল পেয়ে শট নেন অ্যান্থনি গর্ডন, তবে তাঁর শটও অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন এই ক্রোয়াট কিপার।
মাঝে ক্রোয়েশিয়া সমতায় ফেরার কিছু চেষ্টা করলেও ইংলিশ ডিফেন্সের কারণে গোল আদায় করতে পারছিল না। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ধরে রাখতে এবং আক্রমণের ধার বাড়াতে ইংলিশ কোচ টমাস টুখেল কৌশলগত কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি মাঠে নামান বুকায়ো সাকা ও মার্কাস র্যাশফোর্ডকে।
টুখেলের সেই চাল শতভাগ সফল হয় ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে। ডানপ্রান্ত থেকে বুকায়ো সাকার বাড়ানো নিখুঁত পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন মার্কাস র্যাশফোর্ড। এই গোলের সাথেই ক্রোয়াটদের ম্যাচে ফেরার সব আশা শেষ হয়ে যায় এবং ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে।
